আজ রবিবার, | ১৯ নভেম্বর ২০১৭ ইং

শিরোনাম

  মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতায় বিশ্বসুন্দরী হলেন ভারতের মেডিক্যালের ছাত্রী মানুসি চিল্লার   অনৈতিক কাজে জড়াচ্ছে রোহিঙ্গা তরুণীরা   ট্রাকের চাপায় বান্দরবানে এক শিক্ষকের মৃত্যু   ১৯৯৩ সালে নানিয়াচর গণহত্যায় নিহতদের স্মরণে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শোকসভা ও মোমবাতি প্রজ্জ্বলন   রাবিতে ছাত্রী অপহরণের ঘটনায় বামপন্থী ও শিক্ষার্থীদের উপাচার্যের বাসভবন ঘেরাও   হিল ভ্যালি প্রোডাকশন নিয়ে এসেছে চাকমা গান   রংপুরে তাণ্ডব: ৭ দিনেও গ্রেফতার হয়নি ‘মূল হোতারা’   রুয়েটে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত   জেএসএস নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক মামলার প্রতিবাদে ঢাকা শাহবাগে বিক্ষোভ মিছিল   রিপনা চাকমা\'র জীবনের গল্প : কৃষ্ণ এম. চাকমা   উ. কোরিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে সিঙ্গাপুর   জেএসএস নেতা কর্মীদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার,ধর-পাকড় ও হয়রানির প্রতিবাদে বিক্ষোভ   রংপুরে সাম্প্রদায়িক তাণ্ডব: ২ ইউপি সদস্য আটক   রুনা লায়লার জন্মদিন আজ   পাকিস্তানে বুদ্ধের ১৭০০ বছরের সবচেয়ে পুরনো মূর্তি উন্মোচন   আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছে সিটি অব অটোয়া   নিউজিল্যান্ডের বিদায়, ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপে পেরু   রেকর্ড দামে বিক্রি ভিঞ্চির চিত্রকর্ম   উস্কানিমূলক লিফলেট বিতরণকালে ৪ রোহিঙ্গা আটক   বৃষ্টি হতে পারে আরো ২ দিন

বিপ্লবী নেতা এম এন লারমা কিছু স্মৃতি কিছু ঘটনা : মুকুল চাকমা

প্রকাশিত: ২০১৭-১১-১৪ ২১:১৪:১৭

মুকুল চাকমা

জুম্ম জাতির আত্মনিয়ন্ত্রনাধিকার আন্দোলনের পথিকৃৎ মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার জীবনের পরিসর খুবই সংক্ষিপ্ত। সেই সংক্ষিপ্ত পরিসরে আমার পরিচয়ের পরিধি ছিল আরও সংক্ষিপ্ত। যেটা হয়েছিল ১৯৭৬ সালের জুলাই থেকে ১৯৮৩ তাঁর মৃত্যুকাল পর্যন্ত। তার মাঝখানেও পার্টির দায়িত্বে আমাকে বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে মাঠ পর্যায়ে চার বছরের মতো কাজ করতে হয়েছিল। পৃথিবীর বিপ্লবী ইতিহাসের অনেক নেতার ইতিহাস, তাদের আত্মত্যাগের খবর আমরা জানি। কিন্তু যিনি অধিকার হারা, মেহনতি মানুষের প্রতি ভালবাসা ও মুক্তির জন্য সংগ্রামের কঠিন পথ অবলম্বন করে শহীদ হয়েছিলেন, সেই মানুষটির খবর আমরা ক’জনই বা জানি! তিনি কারো কাছে প্রিয়, শ্রদ্ধার ও ভালবাসার প্রতীক আর কারো কাছে জীবন্ত কিংবদন্তী!  

মহান নেতা তাঁর স্বল্পায়ু জীবনে পার্Ÿত্য চট্টগ্রামের শোষিত, নির্যাতিত ও অধিকারহারা জুম্ম জাতির মুক্তির জন্য যে পথ তিনি দেখিয়ে দিয়ে গেছেন তার তুলনা নেই। আমরা অনুভব করি ও মনেপ্রাণে বিশ^াস ও ধারণ করি যে, তিনি ছিলেন একজন সহজাত আদর্শবান বিপ্লবী। তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ^াসী একজন প্রগতিশীল চিন্তাধারার ধারক ও বাহক। চলনে মননে  কাজের মাধ্যেমে তিনি তাঁর চিন্তার ও আদর্শের প্রতিফলন ঘটাতেন। তিনি কেবল পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের অধিকারের কথা বলেননি। তিনি সারা দেশের শোষিত-বঞ্চিত মানুষের অধিকারের জন্য সোচ্চার ছিলেন। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে তাঁর যে গভীর ভালবাসা, ভাবনা ও স্বপ্ন ছিল তা গণপরিষদে ও জাতীয় সংসদে দেয়া তাঁর বক্তব্য থেকে সহজেই বুঝা যায়। প্রয়াত নেতা এখন আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু পার্Ÿত্য চট্টগ্রামের জনগণকে দাবী আদায়ের জন্য উজ্জল পতাকা হাতে নিয়ে সারিবদ্ধভাবে অগ্রসর হতে দেখলে মনে হয়-ঐ তো এগিয়ে আসছেন আমাদের প্রিয় মহান নেতা মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা।

১৯৭০ সালের পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনী প্রচারে তিনি যখন একজন প্রার্থী হয়ে পুরো সংসদীয় এলাকা ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন, তখনই তাঁকে আমি প্রথম দেখি। আমি তখন কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পা বাড়াচ্ছি। আমাদের গ্রামের বাবুছড়ায় স্বর্গীয় রাম মোহন কার্বারীর বাড়ির উঠোনে মিটিং হয়েছিল। এলাকার অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। আমিও আমার মামা স্বর্গীয় সহদেব কার্বারীর সাথে মিটিং-এ গিয়েছিলাম। উল্লেখ করার মতো যে, আমার মামা ছোটকাল থেকে আমাকে তাঁর সঙ্গে বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানে অবশ্যই সঙ্গে নিয়ে যেতেন।

সেদিনের নির্বাচনী কি এজেন্ডা ছিল তা আমার জানা ছিল না। দীর্ঘক্ষণ তিনি বক্তব্য দেন। পাড়ার অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তিকে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে দেখেছি। মিটিং শেষ হলে আমরা সবাই যার যার ঘরে ফিরে আসি। ফিরে আসার একদিন পর আমার মামা সহদেব কার্বারী পাড়ার সবাইকে ডেকে জাতীয় পরিষদে চাকমা রাজা মেজর ত্রিদীব রায়কে হাতি মার্কায় এবং প্রাদেশিক পরিষদে মানবেন্দ্র নারায়ণ (এম এন লারমা) লারমাকে প্রদীপ মার্কায় ভোট দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। সেদিন অবশ্য তিনি তার আগের দিনের মিটিংয়ের বিষয়ও পাড়াবাসীর সামনে সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরেন। যথারীতি ভোট হয়ে গেল। দুজন প্রার্থীই জয়লাভ করলেন। এ খবর শুনে আমার মামা খুব খুশী হয়েছিলেন, যা এখনো আমার মনে পড়ে। তিনি প্রয়াত নেতা এম এন লারমা ও চাকমা রাজার খুব ভক্ত ছিলেন।

আমি কখনো ভাবিনি বা সে রকম কোনো চিন্তা বা কল্পনাও করিনি প্রয়াত নেতা এম এন লারমা’র সঙ্গে বছর তিনেকের কাছাকাছি একসঙ্গে থাকার সুযোগ আমার জীবনে ঘটবে। যা ছিল আমার জন্য অবিশ^াস্য ও অনুপ্রেরণার।১৯৭৬ সালের জুলাই মাসে আমাকে হেডকোয়ার্টারে বদলী করা হয় (করল্যাছড়ি ছিল ছদ্মনাম)। সেটা যে হেডকোয়ার্টার ছিল তা আমি মোটেই জানতাম না। গোপনীয়তা রক্ষার ক্ষেত্রে এত যে কড়াকড়ি নিয়ম ছিল, তা সত্যিই অকল্পনীয়। তা ছাড়াও কর্মীবাহিনীর মধ্যে ছিল প্রচন্ড সততা, দেশপ্রেম ও কর্তব্যনিষ্ঠা। আমার হেডকোয়ার্টারে তিন মাস অতিবাহিত হওয়ার পর একদিন এক সহকর্মীর মাধ্যমে জানতে পারি, মহান নেতা এম এন লারমা আমাদের সঙ্গে অবস্থান করছেন। অনেকগুলো ব্যারাক ছিল। প্রত্যেকটি ব্যারাকের মধ্যে একটা দূরত্ব বজায় ছিল। বিশেষ কোনো কাজ ছাড়া আমরা এক ব্যারাক থেকে অন্য ব্যারাকে যেতাম না। প্রত্যেক দিন ৭টা হতে রাত ৯টা পর্যন্ত আমাদের রাজনৈতিক ক্লাশ হতো। পার্টিগতভাবে এটি সকল জোন, সেক্টর, কোম্পানী ও এলাকার জন্য প্রযোজ্য ছিল। ক্লাশের জন্য নির্দিষ্ট ঘর/ব্যারাক ছিল। একসঙ্গে ৫০ জনের বসার ব্যবস্থা ছিল। তবে তা সব জায়গায় সম্ভব ছিল না।

প্রত্যেক কর্মী/সৈনিককে পড়ার জন্য বইপত্র দেয়া হতো। যারা লেখাপড়া জানে না, তাদেরকে লেখাপড়া শেখানোর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল যাতে প্রত্যেক সদস্য আক্ষরিক জ্ঞান অর্জন করতে পারে। সে নিয়ম চালু থাকার ফলে বহু ককর্মী আক্ষরিক জ্ঞান লাভে সক্ষম হন। যা ছিল খুবই সফল ও প্রশংসীয় একটা উদ্যোগ। পরবর্তীকালে অনেক কর্মী পার্টির পাঠশালায় লেখাপড়া করে উচ্চতর পদমর্যাদায় দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং পার্টির জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। যা সকলের জন্য শিক্ষনীয় দৃষ্টান্ত। যে সমস্ত কর্মী কম লেখাপড়া জানতেন, সে সমস্ত কর্মীদেরকে লেখাপড়ার গতি বৃদ্ধিকল্পে ২/৩ মাসের জন্য কোয়ার্টার মাষ্টারের দায়িত্ব দেওয়া হতো। নিয়ম ছিল যে, কোয়ার্টার মাষ্টারকে অবশ্যই নিজের হাতের লেখায় প্রত্যেক সপ্তাহে বাজার ফর্দ করতে হতো। এর ফলে তারা দ্রুত শিখে ফেলেন। কোনো কারণে ভুল হলে ডেকে শুদ্ধ করে লেখানোর ব্যবস্থা করা হতো।

কর্মীদের গুণগতমান বৃদ্ধি ও রাজনৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য বিভিন্ন দেশ-বিদেশের আন্দোলন তথা বিপ্লবী ইতিহাসের বই বিশেষ করে চীন, রাশিয়া, ল্যাতিন আমেরিকাসহ অন্যান্য প্রগতিশীল আন্দোলন সম্পর্কিত বই পড়ার জন্য দেওয়া হতো। শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ণয় করে বইগুলো পড়ার পরামর্শ থাকতো। জ্ঞানার্জনের মাপকাঠি নিরূপনে মাঝে মাঝে পরীক্ষা ও বক্তব্য প্রদানের ব্যবস্থা করা হতো। এগুলো ছাড়াও সিনিয়র কম্যান্ডার এবং রাজনৈতিক সচিবগণ মাঝে মাঝে আমাদের আন্দোলন সম্পর্কে বিশেষ করে ‘আমরা কেন আন্দোলন করছি, কার জন্য, কার স¦ার্থে’ এবং আমাদের আন্দোলনে শত্রু কারা, মিত্র কারা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন।

আমরা যে ইউনিটে ছিলাম তার নাম ছিল বিশেষ কোম্পানী। কোম্পানী কম্যান্ডার ছিলেন রূপায়ণ দেওয়ান এবং সহকারী কোম্পানী কম্যান্ডার ছিলেন বিজয় সিংহ চাকমা। হেডকোয়ার্টারে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকার সুবাদে আমাদের কোম্পানীতে মোট দুইশ’র অধিক কর্মী ছিলেন। তবে হেড কোয়ার্টারের কতজন ষ্টাফ ছিলেন, তা আমরা জানতাম না।
যে জায়গাতে আমরা ছিলাম, সেটি ছিল অত্যন্ত দুর্গম ও কন্টকাকীর্ণ। যোগাযোগ ছিল কষ্টসাধ্য। রসদপত্র বহনের ক্ষেত্রে ছিল চরম ঝুঁকিপূর্ণ। যেকোনো মুহুর্তে প্রাণহানির আশংকা ছিল। বিশেষ করে রাত্রিবেলায় যোগাযোগের সমস্যাটা ছিল অনেক বেশি। ব্যারাক থেকে পাড়ার দুরত্ব ছিল কম করে হলেও ৬/৭ মাইল। পাড়ার ২/১ জন বিশ^স্ত লোক ছাড়া কেউ আমাদের মূল আস্তানার অবস্থান জানতেন না।

এক নাগাড়ে একই স্থানে ৬/৭ মাস পেরোনোর পর স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত হয়। নতুন জায়গা নির্বাচনের জন্য আমাকেও একজন সদস্য হিসেবে মনোনীত করা হয়। তার কারণ আমি ঐ এলাকার লোক এবং এলাকার জায়গা এবং স্থানীয়দের সর্ম্পকে আমার ভাল ধারণা আছে। নতুন জায়গা সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করার পর আমাদের টীম উর্ধ্বতন মহলে রিপোর্ট জমা দেয়। পরে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত হলে নতুন ব্যারাক তৈরির টীমে আমাকে আবারোও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। একমাস পর সকলে নতুন জায়গায় স্থানান্তরিত হয়।

১৯৭৭ সালে পার্টির জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে বিভিন্ন কোম্পানী, সেক্টরের সিনিয়র পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ বিশেষ করে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যরা (ভিতরে/বাইরে) অংশগ্রহণ করেন। এক নাগাড়ে এক সপ্তাহ পর্যন্ত সম্মেলন চলে। সম্মেলন শেষ হলে গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনা করে দলগতভাবে আগত অতিথিদেরকে ছেড়ে দেয়া হতো, প্রয়োজনে গাইড করা হতো। এ সময়ে মহিলা সমিতির থেকেও প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করে। ঐ সময়ে মহিলা সমিতির একটি টীম হেড কোয়ার্টারে অবস্থান করতো। তাদেরকে শুধু রাজনৈতিক ক্লাশ ও পড়াশোনার জন্য সময় ও সুযোগ দেওয়া হতো। নিয়ম-শৃংখলার তাগিদে তারা অন্য কোনো কাজে অংশগ্রহণ করতে পারতেন না।

ঐ সময়ে মাঝে মধ্যে প্রয়াত নেতা এম এন লারমা সৈনিকদের খবরাখবর নেওয়ার জন্য ব্যারাকে ব্যারাকে ঘুরতেন। বিভিন্ন সমস্যা, সুবিধা-অসুবিধা সম্পর্কে জানার চেষ্টা করতেন এবং পরামর্শ দিয়ে যেতেন। তিনি দিনের অধিকাংশ সময় পড়াশুনা ও লেখালেখির কাজে ব্যস্ত থাকতেন। কোনো এক সময়ে তিনি আমার সাথে দীর্ঘক্ষণ কথা বলার পর এক পর্যায়ে আমাকে বললেন, ‘তুমি চলে যাও, উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করে আবার চলে এসো। ভবিষ্যতে আমাদের অনেক নেতার প্রয়োজন হবে। তোমাদেরকে নেতৃত্বের আসনে বসতে হবে।’ সেদিন তিনি কী ভেবে বা কী উদ্দেশ্যে আমাকে পড়াশোনা করার জন্য বলেছিলেন, তা আমার জ্ঞানের বাইরে ছিল। তার প্রতিউত্তরে আমার বক্তব্য ছিল, ‘আমার বাবা আমাকে সক্রিয়ভাবে পার্টির কাজে অংশগ্রহণের আপত্তি করেছিলেন এবং উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পর যোগ দিতে বলেছিলেন।’ আমার একান্ত সিদ্ধান্তের পর বাবা বলেছিলেন, ‘বিজয়ের বেশে যখন ফেরত আসতে পারবে, তখন আসবে; তার আগে নয়।’ আমার কথাগুলো শুনার পর তিনি অধিকতর পড়াশোনা ও ভালোভাবে কাজ করার পরামর্শ দিয়ে সেদিন নিজ ব্যারাকে ফিরে যান।

তিনি যখন সৈনিকদের সাথে কথা বলতেন, প্রত্যেক বিষয় জানার চেষ্টা করতেন। এখনো মনে পড়ে, একদিন এক সৈনিক খাওয়ার বিষয়ে সীমাবদ্ধতার কথা বললেন। অর্থাৎ মাসে এক বেলা মাংস থেকে ২/৩ বার হলে ভালো হয় এবং তা সীমিত না রেখে পর্যাপ্ত পরিমাণ হওয়া দরকার। উল্লেখ্য যে, সে সময়ে প্রত্যেকটি বিষয়ে যেমন- খাওয়া-দাওয়া, পোশাক-পরিচ্ছদ ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যবহার্য বিষয়ে কঠোর নিয়ম-শৃংখলা ছিল এবং যা ব্যবস্থা ছিল তাও খুব সীমিত। ভাবতেই আশ্চর্য লাগে, সে সময়ে আমাদের চাওয়া-পাওয়া তেমন ছিল না। যা পেতাম তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতাম। ভরনপোষণ বা বৈষয়িক নিয়ে কোন চাহিদা ছিল না।

সেদিন ঐ কর্মীর বক্তব্য শোনার পর যতদূর মনে হয় তিনি সিনিয়রদের সাথে কথা বলেছিলেন। তিনি পরামর্শ দিয়েছিলেন, ‘যেদিন মাংস দিয়ে খাওয়ানো হবে, সেদিন যাতে সবাই পেট ভরে খেতে পায় সে ব্যবস্থা করা। সেটা আর্থিক বিবেচনায় মাসে একবার হোক বা ২ বার হোক।’ পরে বিষয়টি আমরা জানতে পারি।  উনার পরামর্শ যখন কার্যকরী হয় তখন সবাই খুশী। এরপর থেকে এ বিষয় নিয়ে কোনোদিন কথা উঠেছে বলে আমার জানা নেই। আমার অভিজ্ঞতায় বলে, তিনি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সবসময় নি¤œস্তরের কর্মীদের দেখাশুনা করতেন ।

তখনকার সময়ে আমাদের চাহিদা ছিল এতই সীমিত, মোটামুটি নেই বললেই চলে। সুগন্ধী জাতীয় কোন দ্রব্য নিরাপত্তাজনিত কারণে আমরা ব্যবহার করতাম না। পকেট খরচের জন্য কোন টাকা-পয়সা দরকার হতো না। যা দেয়া হতো, তা দিয়ে সবাই সন্তুষ্ট থাকতাম। ভবিষ্যত কি হবে, না হবে এ নিয়ে কেউই ভাবতো কি না সন্দেহ; শুধু সকলের একটাই উদ্দেশ্য- জুম্ম জাতির অধিকার আদায়ে কাজ করে যাওয়া, প্রয়োজনে শেষ রক্তবিন্দুও দেশের ও জাতির জন্য উৎসর্গ করা।

স্থানীয় জনগণের সাথে আমাদের সম্পর্ক ছিল মধুর। যে পাড়া বা গ্রামগুলিকে কেন্দ্র করে আমাদের ব্যারাক, সে সমস্ত পাড়াবাসীদেরকে আমরা সর্বপ্রকার সহযোগিতা করার চেষ্টা করতাম। প্রত্যেক পাড়াতে আমাদের ওপি (অবজারবেশন পোস্ট) থাকতো। প্রত্যেক পোষ্টে ২ বা ৩ জনকে সিভিল পোশাকে নিয়োজিত করা হতো। দিনের বেলায় এদের কাজ ছিল- ‘শত্রুর বা তাদের চরদের গতিবিধি লক্ষ্য করা’। বাইরের তথ্য সংগ্রহ করা এবং পাড়াবাসীদের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে সাংগঠনিক তৎপরতা চালানো। রাত্রিবেলায় পাড়ায় না থেকে জঙ্গলে বা নিরাপদ জায়গায় এরা অবস্থান করতেন। কোনো পাড়ায় রাত্রিবেলায় শত্রুর আগমন ঘটলে বিভিন্ন সাংকেতিক শব্দের মাধ্যমে জানান দেওয়া হতো। যা ছিল অত্যন্ত কার্যকর ও উপযোগী।

দিনের বেলায় তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে গণলাইন ছিল এমন একটা মাধ্যম, যা শত্রু বাহিনী ক্যাম্প থেকে বের হওয়ার সাথে সাথে অনেক দূরবর্তী স্থানেও খবর পৌঁছে যেতো। জনগণই শক্তির মূল উৎস। রাতের বেলায় তথ্য পাওয়া তেমন সহজবোধ্য ছিল না। শত্রুরা যখন সন্দেহ বা তাদের ইনফরমারের ভিত্তিতে গ্রাম ঘিরে ফেলে, অনেক অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করার পরও তারা কখনো মূল আস্তানা দেখিয়ে দেননি। বিশেষ ক্ষেত্রে যদি বাধ্য হতে হয় তারা বিভিন্ন পন্থা কৌশল অবলম্বন করে ব্যারাক ত্যাগের পরামর্শের খবর আগেভাগে দেওয়ার চেষ্টা করতো।
পার্বত্য চট্টগ্রামের আন্দোলনের ইতিহাসে সাধারণ জনগণের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি। জনগণের অনেক স্বপ্ন ছিল। যে স্বপ্নের জাল বুনে তারা পার্টির কর্মীদেরকে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য সব নির্যাতন-অত্যাচার নিরবে সয়েছেন। না খেয়ে কর্মীবাহিনীকে খাওয়াতেন যা সত্যিই উৎসাহব্যঞ্জক ও প্রেরণাদায়ক।

গোপনে জুগিয়েছেন কর্মীবাহিনীর খাদ্য, অর্থ ও নিরাপত্তা। নিজের কাঁধে বহন করে সরবরাহ করতেন সবকিছু। তাদের ত্যাগ ও মহানুভবতার কথা এই স্বল্প পরিসরে বর্ণনা করা খুবই কঠিন। অনেকে জীবন দিয়েছেন, দিয়েছেন তাদের অকৃত্রিম ভালোবাসা ও অফুরন্ত সমর্থন। সয়েছেন নির্বিচারে শত্রুর অত্যাচার ও উৎপীড়ন। বিনাবিচারে আটক ও জেল-জুলুম করেছেন সহ্য। এত কিছুর পরেও তারা চেয়েছেন কর্মীবাহিনী ও পার্টিকে টিকিয়ে রাখতে। অনেক অবর্ণনীয় করুণ পরিণতি তাদের ভোগ করতে হয়েছে। বিনিময়ে তারা কিছুই চাননি। কেবল চেয়েছেন জুম্ম জাতির অধিকার ও বিজাতীয় শাসন-শোষন থেকে মুক্তি।

প্রয়াত নেতা জনগণকে শ্রদ্ধা করার এবং তাদের মতামত গ্রহণ করার জন্য সবসময় পার্টি কর্মীদেরকে পরামর্শ দিতেন। তিনি জনগণের সাথে থেকে কাজ করার ইচ্ছে পোষণ করতেন, কিন্তু ভিন্ন বাস্তবতায় যা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা বিষয়টি বিবেচনা করে সাধারণতঃ একটি ব্যারাকে দীর্ঘ সময় থাকা যেতো না। বছরের কাছাকাছি হওয়ার সুবাদে ব্যারাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। প্রয়াত চন্দ্র শেখর চাকমার নেতৃত্বে ৭ জনের একটি টীমকে নিরাপদ জায়গা খোঁজার দায়িত্ব দেওয়া হয়। একসময় ওয়া¹ায় আমাদের ছুটিরত একজন কর্মী সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়ায় জরুরী ভিত্তিতে ব্যারাক বদলের প্রয়োজন পড়ে। স্থানীয় একজন গ্রামবাসীর (আসল নামটা মনে নেই, তবে মেনকা বাপ নামে আমাদের কাছে সমধিক পরিচিত) সহায়তায় নিরাপদ জায়গা খোঁজার জন্য আমাদের টীম বের হয়। জায়গাটা নিরাপদ, কিন্তু রসদ পরিবহনে কষ্টকর ও দূরবর্তী হওয়ায় নির্বাচিত জায়গার বদলে বিকল্প একটি জায়গা নির্বাচন করা হয়।

ব্যারাক নির্মাণের কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি, কিন্তু নিরাপত্তার কথা ভেবে আমরা প্রয়াত নেতাসহ ১৫ জনের একটি দলকে একটি মোনঘরে থাকার ব্যবস্থা করে দিই। ঐ জুমিয়ার নাম কি ছিল ঠিক জানা নেই। আমরা অবশ্য ইচ্ছে করেও আসল নাম জানার চেষ্টা করতাম না। চৌগুইত্যা বাপ হিসেবে তিনি সকলের কাছে পরিচিত ছিলেন। তাঁর কোন পুত্রকন্যা ছিল কিনা জানার চেষ্টা করা হয়নি। দুয়েকদিন অবস্থানের পর ইতিমধ্যেই চৌগুইত্যা বাপের সঙ্গে আমাদের দলের লোকদের সুসম্পর্ক হয়ে যায়। প্রয়াত নেতাকে অন্য নামে ডাকা হতো। গোপনীয়তা রক্ষার্থে একে অপরকে আমাদের টিমের সদস্যরা স্যার সম্বোধন করতো।

চৌগুইত্যা বাপের কুকুর একটি ও একটি বিড়াল ছিল। খুব রসিক ধরনের মাঝে মাঝে হাসি-ঠাট্টা ও আনন্দ-ফুর্তি করতেন বিশেষ করে রনিদার সাথে। লোকটা খুব সহজ-সরল প্রকৃতির। এমএন লারমা যে তাঁর বাড়িতে থাকেন, তিনি কোনোদিন জানতে পারেননি, এমন কি জানারও চেষ্টা করেননি। রনিদা ছিলেন গ্রুপ কম্যান্ডার। তিনি মাঝে মাঝে চোগুইত্যা বাপের সাথে কৌতুক করতেন এবং ইংরেজি শিখিয়ে দিতেন। কোনো কাজে বাইরে গেলে ফিরার পর তার ডগ, ক্যাট কোথায় জিজ্ঞাসা করতেন। নতুন কোনো কিছু পেলে তা সকলকে খাওয়ার জন্য ভাগ দিতেন। সে এলাকায় আরও দুইটি জুমিয়া পরিবার ছিল, কিন্তু তাদের সাথে তেমন যোগাযোগ ছিল না। ২০ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর আমাদের টিম চৌগুইত্যা বাপের মেনঘর হতে নতুন জায়গায় চলে আসে।

১৯৭৮ সালের সেপ্টেম্বর মাস। শীতের আগমনী বার্তা শুরু হয়েছে। কেন্দ্রীয় কমিটির বিশেষ জরুরী সম্মেলন। অধিকাংশ কেন্দ্রীয় নেতা ইতিমধ্যেই হেডকোয়ার্টারে পৌঁছে গেছেন। আমার ধারণা মতে দুর্গম ও দূরবর্তী অবস্থানের কারণে ৪নং সেক্টর ও ১নং সেক্টর এর থেকে কোন প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করতে পারেননি বা তাদেরকে ডাকা হয়নি। সে সময়কার একটি ঘটনা আমাকে বারবার তাড়িত করে, যা এখনো পর্যন্ত আমার বিবেককে নাড়া দেয়। ঘটনাটি হলো-

ব্যারাকের পাকঘরের সামান্য দূরে খাদ্যের উচ্ছিষ্ট ময়লা, আবর্জনা রাখার জন্য এক জায়গায় গর্ত খনন করা হতো। যা ছিল আমাদের একটা অন্যতম শৃংখলা। ঐ গর্তের ময়লা-আবর্জনা খাওয়ার জন্য দিনে এবং রাতে বিভিন্ন প্রজাতির পশুপাখী ও বন্যপ্রাণীর আগমন ঘটতো। প্রায় সময়ই বন্যপ্রাণীর মধ্যে বনবিড়াল, শিয়ালসহ নানাবিধ প্রাণীর সন্ধ্যার পর ঐ ময়লা-আবর্জনা খাওয়ার জন্য আনাগোনা হতো। একদিন ডা. সুমেন্টু ঐ সমস্ত প্রাণীদেরকে ধরার জন্য একজন সহযোগীকে সঙ্গে নিয়ে ফাঁদ পাতলেন। হঠাৎ একদিন ঐ ফাঁদে একটা বনবিড়াল ধরা পড়ে। বিড়ালটি ধরা পড়ার সাথে সাথে হট্টগোল শুরু হয়ে গেল। যারা সেদিনের নিরাপত্তার কাজে জড়িত ছিলেন তারাই প্রথম বিড়ালের ফাঁদে পড়ার শব্দটি শুনতে পান। ইতিমধ্যেই ডিউটিরত কর্মীরা বিড়ালটিকে মেরে ফেলে পাকঘরের এক কোণায় রাখেন। ভালমন্দ খবরাখবর নেওয়ার জন্য সবাই ঘটনাস্থলে উপস্থিত। নানা জনের নানা মতের ভিত্তিতে সর্বশেষ সিদ্ধান্ত হলো- বিড়ালটি কাল খাওয়া হবে এবং যারা ইচ্ছুক খেতে পারবেন। তবে তাদেরকে হয় সবার আগে লঙ্গরখানায় আসতে হবে, নয়তো বা সর্বশেষ আসতে হবে। ব্যারাকের হঠাৎ অস্বাভাবিক আওয়াজ ও হট্টগোলের খবর নেতাও টের পেয়েছিলেন। তিনি কোনকিছু হয়েছে কিনা জানতে চেয়েছিলেন। জুনিয়র কর্মীদের সার্বিক দিক বিবেচনা করে কিছু সত্য কিছু মিথ্যা মিশ্রণ করে অন্যভাবে সিনিয়ররা উত্তর দিয়েছিলেন।

সকলে একমত হলেন যে, পুরো বিষয়টি যাতে নেতার কর্ণগোচরে না যায় সে ব্যবস্থা অবলম্বন করা। জানতে পারলে তিনি খুব মনঃকষ্ট পাবেন। সবকিছু ঠিকভাবে চলছিল। পরষ্পরের জানাজনির মাধ্যমে যা করার তাই হয়ে গেল। ভুলক্রমে অসীমের সাথে এ বিষয়টি নিয়ে কেউ আলোচনা করেনি। অসীম নামে এক কর্মী নেতার খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে দৈনন্দিন সকল সুবিধা-অসুবিধাগুলি দেখাশুনা করতেন। অসীম অত্যন্ত সৎ, সত্যবাদী ও সহজ-সরল। নেতার এবং অসীমদের পরিবারের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে নেতার সম্মতিতেই অসীমকে ঐ দায়িত্ব দেওয়া হয়। একটা বিষয় লক্ষ্যনীয় যে, তিনি (নেতা) ভাত খাওয়ার জন্য সবার শেষে লঙ্গরখানায় যেতেন। যারা বাবুর্চি থাকতেন, তাদের সঙ্গে প্রায়ই একসঙ্গে খেতেন। সময় ও সুযোগে প্রত্যেকের সুখ-দুঃখের খবরাখবর নিতেন বা জানার চেষ্টা করতেন, প্রয়োজনে পরামর্শ দিতেন। সেদিন যথারীতি অসীমকে নিয়ে ভাত খাওয়ার জন্য লঙ্গরখানায় আসেন। পরিকল্পনামাফিক নেতা পৌঁছার আগেই বাবুর্চিরাও খাওয়া সেরে ফেলেন; কারণ একসঙ্গে খেলে মাংস খাওয়া যাবে না। সেদিন বিড়ালের ফাঁদ পাতার কথা অবশ্য নেতাকেও বলা হয়েছিল। কিন্তু ফাঁদে ফেলে বিড়ালকে যে মেরে ফেলা হয়েছিল তা গোপন রাখা হয়।

খাওয়ার এমনি এক পর্যায়ে হঠাৎ করে রাতের হট্টগোলের প্রসঙ্গ চলে আসে। অসীম রাখডাক না করে যা শুনেছে বা জেনেছে সব খুলে বলে ফেলে। এতে নেতা খুবই ব্যথিত হন। তিনি কাউকে কিছু না বলে অর্ধেক ভাত খাওয়া শেষ করে নিজ ব্যারাকে চলে যান। অসীমকে পরে আসতে বলেন। সেদিনের ঘটনাটি বিশেষ করে সিনিয়র নেতৃবৃন্দের  সত্য-মিথ্যা মিশ্রিত কথা উনাকে বেশ মর্মাহত করেছিল। তিনি স্বপ্নেও কল্পনা করেননি যে তাঁকে মিথ্যা বলা হবে। এক নাগাড়ে তিনদিন পর্যন্ত খাওয়ার জন্য তিনি লঙ্গরখানায় আসেননি। তিনি খুব কষ্ট পেয়েছিলেন। সিনিয়র নেতৃবৃন্দের সাথে এ বিষয়ে তিনি কি আলাপ করেছিলেন তা আমরা আর জানা হয়নি। পরে জানতে পারি যে, পরিবেশ সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ বিষয় নিয়ে তিনি নাকি ঘন্টাখানেকের মতো একটা বক্তৃতা দিয়েছিলেন। ঐ বক্তৃতায় তিনি পার্টির একজন দায়িত্ববান কর্মী হিসেবে প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণে দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কেই বলেছিলেন। এমন কোনো শব্দ তিনি ব্যবহার বা উচ্চারণ করেননি যে তিনি ঐ দিনের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ঐ বক্তব্যগুলি দিচ্ছেন।

আমি যতটুকু দেখেছি তিনি সরাসরি কাউকে কোনো নির্দেশ বা আদেশ দিতেন না। ভদ্র ও নরম ভাষায় যা বলার বলতেন। কোন একদিন একজন সিনিয়র কর্মীর বিরুদ্ধে সামাজিক দুর্নীতি নিয়ে অভিযোগ উত্থাপিত হওয়ায় ঐ কর্মীকৈ ডেকে শুধুই নাকি বলেছিলেন, আমি ঐ ধরনের কাজকে অত্যন্ত ঘৃণা করি। প্রয়াত নেতা এম এন লারমা একজন প্রকৃতিপ্রেমী ও পরিবেশবাদী ছিলেন। ব্যারাক তৈরির ক্ষেত্রে অনেক গাছ-গাছড়া ও বাঁশ কর্তন করতে হয়। সে ক্ষেত্রে তিনি পরামর্শ দিতেন যদ্দূর সম্ভব সীমিত পর্যায়ে গাছ ও বাঁশ কাটতে। যেগুলো না কাটলে চলে না শুধু সেগুলোই কাটার জন্য পরামর্শ দিতেন। তিনি গাছ ও বাঁশের প্রয়োজনীয়তার কথা বলতেন। প্রাকৃতিক সম্পদের সাথে মানুষের যে একে অপরের পরিপূরক নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে তা আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিতেন।

তিনি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের বিষয়ে খুবই সিরিয়াস ছিলেন। আমাদের দ্বারা বন্যপ্রাণীর ক্ষতির দিকটা তিনি পছন্দ করতেন না। বন্যপ্রাণী কেন প্রয়োজন, তার উপকারিতা ইত্যাদি ব্যাপারে আমাদের সাথে সময় ও সুযোগ নিয়ে আলোচনা করতেন। আমার এখনও মনে আছে, জঙ্গল ঘুরতে গিয়ে আমাদের একটি দল আনুমানিক চার কেজি ওজনের একটি কচ্ছপ পায়। চাকমা ভাষায়  এ প্রজাতির কচ্ছপকে ‘মোনদুর’ বলে। ‘দুর’ অর্থ কচ্ছপ আর ‘মোন’ অর্থ পাহাড়। এগুলি সাধারণতঃ গহীন অরণ্যে ও পাহাড়ে থাকে বলে চাকমারা মৌনদুর বলে। বর্তমানে এধরনের প্রাণী পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে প্রায় বিলিন হয়ে গেছে । সে সময় প্রয়াত নেতাও ব্যারাকে ছিলেন। কচ্ছপটিকে যখন ব্যারাকে আনা হয় একনজর দেখার জন্য সবাই উপস্থিত। খবর পেয়ে প্রয়াত নেতাও উপস্থিত হন। বিভিন্ন জনের বিভিন্ন কথোপকথনের এক পর্যায়ে তিনি আলোচনায় অংশগ্রহণ করে বললেন, ‘কোথায় পেয়েছ, এর সঙ্গে আরো ছিল কিনা, এখন কি করা হবে, এগুলোতো হারিয়ে যেতে বসেছে’ ইত্যাদি ইত্যাদি। কারোর কাছ হতে কোনো সঠিক উত্তর নেই। এক পর্যায়ে একজন বললেন, এগুলো যেহেতু বিলুপ্ত হতে চলেছে তাহলে এখন কি করবো স্যার, আপনি বলুন। তিনি সকলের প্রতি দৃষ্টি নিবন্ধ করে পাল্টা প্রশ্ন করলেন, ছেড়ে দিলে কি হয়, নিরীহ প্রাণী, এগুলো হারিয়ে যেতে বসেছে? সবাই নেতার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে মোনদুরটি ছেড়ে দেয়ার পক্ষে সহমত পোষণ করে দূরবর্তী জায়গায় ছেড়ে দেয়া হয়।

রাত্রিতে আমরা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে ব্যারাকের পাশ^বর্তী ছড়ায় কাঁকড়া ধরতাম। কাঁকড়ারা সাধারণতঃ দিনের বেলাায় গর্তে থাকে এবং রাত্রিবেলায় খাদ্য অন্বেষণের জন্য গর্ত থেকে বের হয়। এটার একটা সুবিধা ছিল রাত্রিতে কাঁকড়া ধরলে সহজে তাদেরকে ধরা যায়। দুই তিন দলে বিভক্ত হয়ে ঘন্টা দুয়েক পরিশ্রম করলে অনায়াসে একদিনের তরকারীর উপযোগী কাঁকড়া পাওয়া যেতো। তিনি নিজেও কাঁকড়া খেতেন। কাঁকড়া ধরার কৌশল সম্পর্কে জানার পর তিনি আমাদেরকে পরামর্শ দিলেন রাতের বেলায় না ধরে দিনের বেলায় ধরার জন্য। কারণ রাত্রিতে ধরলে অধিকাংশ কাঁকড়া ধরা পড়বে। পরবর্তীতে তারাও হারিয়ে যাবে। সবচেয়ে যে বিষয়টা তিনি আমাদেরকে বুঝাতেন  তা হলো- তারা তো খাদ্যের জন্য, তাদের উদর পুর্তির জন্য বের হয়, কাউকে ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে নয়; তাহলে আমরা ঐ সময়ে তাদের মারতে যাবো কেন? তারপর থেকে আমরা কোনদিন আর রাত্রিতে কাঁকড়া ধরতে যায়নি। যা পরবর্তীকালে অলিখিত নিয়ম হয়ে যায়।

তিনি সুন্দর বাঁশী বাজাতেন। তিনি সব সময় তাঁর সঙ্গে একটা বাঁশি রাখতেন। এখনো স্মরণ করি আমাদের সহপাঠি উতঙ্গ, বিপিন, সমরজিৎ ও হিরোসহ অনেকেই উনার কাছ থেকে বাঁশী বাজানো শিখেছেন। একমাত্র বিপিন, সমরজিৎ ও উতঙ্গ বাদে কেউই ভালোভাবে রপ্ত করতে পেরেছিলেন বলে আমার জানা নেই। জনগণের উপর আস্থা ও বিশ^াস রাখতে, জনগণের উপর ভরসা করতে প্রয়াত নেতা আমাদের বার বার শেখাতেন। যতক্ষণ আমরা প্রকৃতভাবে তাই করতে পারবো, ততক্ষণ জনগণ চিরকালের মতো আমাদের পাশে থাকবে এবং দেওয়ালের মতো কাজ করবে। শত অত্যাচার-নির্যাতন অথবা লেলিহান দাবানলের সামনে পড়লেও তারা আমাদের কখনো ছেড়ে যাবে না।

তিনি জনগণকে জুমে ও মাঠে ফসল রোপণ করার কাজে সাহায্যের জন্য পরামর্শ দিতেন। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে জ¦ালানী কাঠ সংগ্রহ করার কাজে, মালিকের অনুমতি সাপেক্ষে রান্নাবান্নার কাজেও সহযোগিতা করতে পরামর্শ দিতেন। এ দুয়ের ফলে স্থানীয়দের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন এবং নিজের উদ্দেশ্য সেই সাথে পুরণ হতো। কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে বিশেষ কোম্পানীর বড় অংশকে সামরিক অপারেশন পরিচালনার জন্য ১নং ও ২নং সেক্টরে ডেপুটেশনে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। কোম্পানী কম্যান্ডার দুই সেক্টর কমান্ডারের সাথে আলোচনা করে দুই জায়গায় ভাগ হয়ে অবস্থান করবে। সেক্টর রির্জাভ র্ফোস ও কোম্পানী ফোর্স সমন্বয় করে শত্রু বাহিনীর  উপর আক্রমণ পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়। সে মতে আমাদের দলটি ২৪শে ডিসেম্বর ১৯৭৮ তারিখে হেডকোর্য়াটার হতে ২নং সেক্টরের উদ্দেশ্য যাত্রা শুরু করে। বিদায়ের সময় আমাদের উদ্দেশ্যে প্রয়াত নেতা দীর্ঘক্ষণ বক্তব্য দেন। তিনি সবাইকে জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রনাধিকার আন্দোলনের স্বার্থে নিবেদিতভাবে কাজ করে যাওয়ার জন্য পরামর্শ ও আহ্বান জানান। আমরা ২৭ তারিখ ২নং সেক্টর হেডকোর্য়াটারে পৌঁছি। আমাদের দলের একটি অংশকে ২নং সেক্টরে রেখে বাকী অংশটি ১নং সেক্টরে চলে যায়। সে দলে আমিও ছিলাম।

২৪শে ডিসেম্বর পর হতে প্রয়াত নেতার সাথে আমি সরাসরি যোগাযোগে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি। ব্যক্তিগত কোন চিঠিপত্রও আমি তাঁকে লিখিনি। পরিবর্তিত পরিস্থিতি ও বাস্তবতা বিবেচনা করে ১৯৮২ সালে আবারও বিশেষ কোম্পানীকে হেডকোয়ার্টারে ডেকে আনা হয়। পার্টির গঠনতন্ত্রের ধারা মতে ১৯৮২ সালের ২০শে সেপ্টেম্বর জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ইতিমধ্যেই সকল সেক্টর, কম্যান্ড পোষ্ট বি ও আঞ্চলিক কমিটির কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। সম্মেলনে সকল প্রতিনিধির উপস্থিতির মাধ্যমে সম্মেলনের কার্যক্রম যথারীতি শুরু হয়। এক পর্যায়ে বক্তৃতা মঞ্চে উঠে বিশেষ সেক্টরের সেক্টর কম্যান্ডার পলাশ (ত্রিভঙ্গিল দেওয়ান) অপ্রত্যাশিতভাবে ঔদ্ধত্যমূলকভাবে ঘোষণা করে যে, তারা বর্তমান নেতৃত্ব, দলীয় নীতি-আদর্শ ও কৌশলের প্রতি সন্দিহান। পলাশের বক্তব্য ছিল উত্তেজনামূলক, প্ররোচনামূলক ও আক্রমনাত্মক। সম্মেলনের পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যেন একটুখানি ফু দিলে দপ করে জ¦লে উঠবে অগ্নির লেলিহান শিখা- মুহুর্তেই সব কিছু ধ্বংস, ছাড়খার হয়ে যাবে।

সম্মেলনের পুরো সময় মহান নেতা এম এন লারমা ধৈর্য ও ধীরস্থিরভাবে বিভেদপন্থী তথাকথিত নেতাদের প্রত্যেকের বক্তব্য শুনেন। এবং তার মেধা ও প্রজ্ঞার বলে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সামাল দেন এবং বাস্তব পরিস্থিতি মুল্যায়ন, পার্টি ও জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আন্দোলন সম্পর্কে এক ঐতিহাসিক রূপরেখা শোনান। এতে বিভেদপন্থীদের জোঁকের মুখে নুন পড়ার মতো অবস্থা হয়ে যায়। এহেন পরিস্থিতিতে তাঁকে কখনো অধৈর্য বা বিমর্ষ হতে দেখা যায়নি। দীর্ঘ আলোচনা-পর্যালোচনা, যুক্তি পাল্টা যুক্তির মধ্যে দিয়ে পুরো সম্মেলন চলে। অবশেষে সকলের ঐক্যমতের ভিত্তিতে বর্তমান নেতৃত্বের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা রেখে সম্মেলনের পরিসমাপ্তি ঘটলো। প্রত্যেকেই যে যার অবস্থানে চলে গেলেন।

সম্মেলনের রেশ কাটতে না কাটতেই প্রীতি কুমার চাকমা (প্রকাশ) স্বদর্পে ঘোষণা দিলেন, তারা দলীয় নীতি-আদর্শ, সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্ত মানবে না। তারা দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামের সম্পূর্ণ বিরোধী এবং দ্রুত নিস্পত্তি লড়াইয়ে বিশ^াসী। এই শ্লোগানের ভিত্তিতে তারা ইতিহাসের চাকাকে বিপরীত দিকে ঘোরাবার ব্যর্থ অপচেষ্টা চালাতে থাকে। এক পর্যায়ে তারা নিজেদেরকে ‘দ্রুতনিষ্পত্তি’ লড়াইয়ে বিশ^াসী অর্থাৎ চাকমা ভাষায় যাকে বলে ‘বাধী’ আর মূল পার্টির নেতৃত্বকে ‘দীর্ঘস্থায়ী’ সংগ্রামে বিশ^াসী যাদেরকে ‘লাম্বা’য় আখ্যায়িত করে সকল স্তরে অপপ্রচারণামূলক কার্যক্রম চালাতে থাকে।

ফলে বিভ্রান্তিতে পড়ে সাধারণ কর্মীবাহিনী ও জনগণ। পরিস্থিতি দিন দিন অবনতির দিকে ধাবিত হতে থাকে। কেন্দ্রের কার্যক্রম ও বিভিন্ন সেক্টর, কোম্পানীর সাথে যোগাযোগেও তারা বাধা দিতে থাকে। এমনকি রসদপত্রের লাইন পর্যন্ত বন্ধ করে দেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করে। অনেক চেষ্টা করার পরও গিরি-প্রকাশ-দেবেন ও পলাশকে হেডকোয়ার্টারে ডেকে সমস্যা সমাধানের সুযোগ না থাকায় অবশেষে ১৪ই জুন ১৯৮৩ ইং বিভেদপন্থীদের সাথে মূল পার্টির নেতৃত্বের সামরিক সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে জুম্ম জাতির মহান সংগ্রামে একটি কালো অধ্যায়ের সূচনা হয়। যা ছিল অনাকাঙ্খিত, আত্মঘাতিমূলক ও অনভিপ্রেত। লড়াই সংগ্রামের ইতিহাসের পাতায় নতুন করে সংযোজিত হলো একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়- গৃহযুদ্ধ।
গৃহযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আমাকে প্রায়ই ফাইটিং গ্রুপের সাথে থাকতে হয়েছিল। দিন তারিখ মনে নেই। খুব সম্ভবত অক্টোবর মাসের কোন এক সময় হবে। আমাকে চিঠির মাধ্যমে হেড কোয়ার্টারে ডাকা হলো। একজনকে আমার দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে আমি হেড কোয়ার্টারে চলে যাই। সেখানে তখন সবাই ছিলেন। অস্থায়ী আস্তানা। নিজস্ব কোনো ব্যারাক ছিল না। বৃষ্টি হলে সব ভিজে যেতো।  জরুরী মুহুর্ত, তাই স্থায়ী আবাসন বা ব্যারাক গড়ে তোলা হয়নি। ফিল্ড কম্যান্ডারের সাথে প্রয়োজনীয় কথাবার্তা সেরে ফেললাম। পরে জানানো হলো আমাকে আরো তাদের সঙ্গে ৪/৫ দিন থাকতে হবে।

উল্লেখ্য, তখন কিন্তু আমাদের প্রচন্ড দুর্ভিক্ষ চলছিল। একদিকে টাকা-পয়সার অভাব, অন্যদিকে খাদ্যের অভাব। সাথে পরস্পর বিশ^াসের অভাব। টাকা থাকলেও চাল পাওয়া যেতো না। তখন প্রত্যেক সদস্য ২০০ গ্রামের উর্ধ্বে কেউ খেতে পেতেন না। এ ক্ষেত্রে কারোর কোন আপত্তি বা অনুযোগ-অভিযোগ ছিল না। সে সময় সকলেই বিশেষ করে সৈনিকেরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, প্রয়াত নেতাসহ আরো নেতৃস্থানীয় কয়েকজনকে তারা প্রয়োজন মাফিক খাদ্য খাওয়াবেন।

একদিন প্রয়াত নেতার সাথে ভাত খাওয়ার জন্য আমাকে ডাকা হলো। আমি সব জেনেও না জানার ভান করে যারা বাবুর্চি তাদেরকে বললাম, আমার আজ ক্ষুধা নেই- বেশি খেতে পারবো না। ১৫০ গ্রাম হলেই চলবে। তখন নেতা আমাকে বললেন, না! তোমাকে পরিমাণ মতো খেতে হবে। কারণ তোমরা পার্টির ভবিষ্যৎ। তোমাদের মতো আমি তো যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধ করতে পারি না। বরঞ্চ আমার কম খাওয়া উচিত। কারণ আমি শুধু ব্যারাকের মধ্যে সীমাবদ্ধ, তোমাদের মতো দৌড়াদৌড়ি আমি করি না ইত্যাদি। আমাদের মধ্যে একটা বৈশিষ্ট্য ছিল, আমরা কোনদিন তার সাথে যুক্তিতর্ক করতাম না। সেদিন তার ভাগের অংশ থেকে আমাকে খেতে দিলেন। এ ধরনের অনেক স্মৃতি আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।

এক সময় গৃহযুদ্ধ চরম আকার ধারণ করে। আমাদের বিশ্রামহীন আক্রমনের মুখে বিভেদপন্থীরা কোনঠাসা হয়ে পড়ে। ফলে তাদের দলের বেশ কয়েকজন সদস্য আমাদের দলের কাছে আত্মসমর্পন করেছে। তাদের অনেক ঘাঁটি এলাকা আমাদের দখলে এসেছে। সেই সময়ে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে বিভেদপন্থীরা অনাক্রমণ চুক্তি ও বোঝাপোড়ার জন্য প্রস্তাব পাঠায়। প্রয়াত নেতা প্রস্তাবটিকে সম্মান দেখিয়ে প্রস্তাবের সপক্ষে তাঁর সহকর্মীদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করেন। যদিও অধিকাংশ সিনিয়র ও জুনিয়র কর্মীর মধ্যে এতে সায় ছিল না।

সেদিন ছিল ৮ই নভেম্বর ১৯৮৩ সাল। রূপায়ণ দেওয়ানের নেতৃত্বে একটি টিম ছোট পানছড়ি এলাকায় বিভেদপন্থীদের সাথে কথা বলার জন্য যাবে। সেখানে প্রীতি কুমার চাকমা (প্রকাশ), দেবজ্যোতি চাকমা (দেবেন) সহ বিভেদপন্থীদের অনেক সিনিয়র কম্যান্ডার কথা বলার জন্য অপেক্ষা করেছিল। রূপায়ন দেওয়ানের নেতৃত্বাধীন টিমে আমিও সদস্য ছিলাম। বাকী  দুইজন ছিলেন ২নং সেক্টরের সহকারী সেক্টর কম্যান্ডার দেবংশী চাকমা এবং ই কোম্পানীর সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট আশীষ চাকমা। টিমের সদস্যদেরকে ডেকে ব্রিফিং করলেন মহান নেতা এম এন লারমা নিজে। তাঁর সঙ্গে ছিলেন বর্তমান নেতা জে বি লারমাসহ আরো কয়েকজন। আমার যতদূর মনে পড়ে, সেদিন তিনি বিশ মিনিটের মতো কথা বলেন। ঐ বিশ মিনিটের সংক্ষিপ্ত আলোচনায় তিনি বার বার উচ্চারণ করেছিলেন- দ্বন্দ্ব-সংঘাতের মধ্যেও আমাদের ঐক্য-সংহতি গড়ে তুলতে হবে, আমাদেরকে ক্ষমা করা ও ভুলে যাওয়া নীতির ভিত্তিতে জুম্ম জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করে যেতে হবে। তাই আমাদেরকে ধৈর্যশীল ও সহনশীল হয়ে অধিকার আদায়ের জন্য কাজ করে যেতে হবে। আলোচনা শেষ হলে আমরা সর্বমোট ১৭ জন বিদায় নিই। বিদায়ের সময় তিনি আমাকে বলেছিলেন, মুকুল তোমার সাথে আবার দেখা হবে।

আমরা যথারীতি রওয়ানা হলাম। সরকারি বাহিনীর গতিবিধি লক্ষ্য করে ৯ নভেম্বর রাত্রে কুড়াদিয়া ছড়ায় পৌঁছলাম। সেদিন আমরা আর নদীর পূর্বকুল হতে পশ্চিমকুলে পার হতে পারলাম না। কারণ মাঝখানে খাগড়াছড়ি টু পানছড়ি রাস্তা। সেনাবাহিনীর টহল সবসময় থাকে। নিরাপত্তার দিক বিবেচনা করে স্থানীয়দের সহযোগিতায় একটি ক্যাম্পের নিকটবর্তী জায়গায় সারাদিন কাটালাম।

সন্ধ্যার পর স্থানীয়দের সহযোগিতায় আমরা রাস্তা পার হয়ে পূর্ব পরিচিত এবং বিশ^স্ত একজন স্থানীয় লোকের সহায়তায় জঙ্গলে রাতটা কোনরকমে পার করলাম। ভোর হলে ১১ই নভেম্বর। যোগাযোগের জন্য যে ব্যক্তিকে তারা মনোনয়ন করেছে, তার সাথে যোগাযোগ করে জানতে পারি যে, দূরবর্তী অবস্থানের কারণে তাদের পৌঁছতে একটু দেরী হবে। ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদেরকে অপেক্ষা করতে হবে। সময় তখন আনুমানিক ভোর পাঁচটা কি ছয়টা হবে ঠিক মনে নেই। এর কিছুক্ষণ পর পূর্ব কুল হতে আমাদের একজন অতি বিশ^স্ত লোক এসে খবর দিলো যে, বাঘমারা আক্রান্ত হয়েছে। খুব সম্ভবতঃ অনেক লোক নিহত হয়েছে। তবে আপনাদেরকে বিভেদপন্থীদের সাথে দেখা করতে নিষেধ করা হয়েছে। সামান্য চিরকুট, যা বর্তমান নেতার লেখা ঐ চিঠি রূপায়ন দেওয়ানকে এগিয়ে দিলেন। চিঠি পড়ে রূপায়ন দেওয়ান সবাইকে বললেন, এক্ষনিই আমাদেরকে বাঘমারার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিতে হবে।

পাড়াবাসীদের সহায়তায় রাস্তা পার হয়ে আমরা সবাই বিষন্ন মনে বাঘমারার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। খাওয়া-দাওয়ার কথা নেই, শুধু একটাই লক্ষ্য নির্দিষ্ট সময়ে বাঘমারায় পৌঁছা। সঠিক খবর কারো কাছে নেই। কর্মীবাহিনীর মধ্যে নানা ধরনের আন্দাজ-অনুমান নির্ভর কথাবার্তা। ইতিমধ্যেই খবরটি প্রচার হয়ে গেছে। সাধারণ জনগণ রয়েছে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার মধ্যে। সে এক বিভীষিকাময় ও অরাজক পরিস্থিতি। অনাহারে অনিদ্রায় দীর্ঘ সময় হাঁটার পর অবশেষে ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত অবস্থায় নির্দ্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছি। তখনই ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারি। আমাদের মহান নেতা আর আমাদের মাঝে নেই।

ঘটনার খবর শুনে কার কি প্রতিক্রিয়া হয়েছিল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অধিকাংশ কর্মী কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছেন। কর্মীদের কান্নায় সেদিন আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে গিয়েছিল, যা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। সারাদিন উপোস থেকেও কেউই ভাত খেতে পারলেন না। ইতোমধ্যেই আমাদের নিরাপদ জায়গায় পৌঁছার খবরটা বাঘামারায় পাঠানো হয়েছিল। তারাও আমাদের জন্য উৎকন্ঠা ও উদ্বেগের মধ্যে ছিলেন। কারণ বিভেদপন্থীরা চক্রান্ত করে এই ধরনের ফন্দি এঁটেছিলেন। তবে যদি তারা খবরটা আগে ভাগে পেতেন নিশ্চয়ই আমাদের টিমকে আক্রমণ করতেন। তখন আমাদের আরো অনেক ক্ষতি  মুখোমুখী হতে হতো। মূলতঃ বিভেদপন্থীদের উদ্দেশ্য ছিল, শক্তি হ্রাস করে হেডকোয়ার্টার আক্রমণ করা এবং চিরতরে মূল নেতৃত্বকে নিচ্ছিন্ন করে আন্দোলনকে ধ্বংস করা।

১২ই নভেম্বর আমরা বাঘমারায় পৌঁছি। তখন সবাই আমাদেরকে বুকে জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটি শুরু করে দিলেন। আমরা অপ্রকৃতিকস্থ, হতবিহ্বল। কারো মুখে কোন কথা নেই শুধু চোখের পানি ছাড়া। সে এক করুণ ও বিভৎস অবস্থা। পার্টির ফিল্ড কমান্ডার মহোদয় আমাদেরকে ডেকে পাঠালেন। কুশলাদি জেনে নিয়ে তারপর সেদিনকার ঘটনার বিবরণ সংক্ষিপ্ত আকারে শুনালেন। তখন মনে পড়ল সেই দিনটির কথা, তিনদিন আগের যে দিনটিতে প্রয়াত নেতা এম এন লারমা আমাদেরকে বিদায়ের সময় বলেছিলেন- আবার দেখা হবে। ভালোভাবে যেও, সতর্ক ও সাবধানে থেকো। তিনদিন পর আমরা যখন ফিরছি, আমাদের পরম পূজ্য নেতা অন্তিম শয়নে শায়িত। খাঁ খাঁ করছে পুরো এলাকা। সব সময় মনে হয় সবকিছু যেন হারিয়ে গেছে। যেন মনে হয় শূণ্যতার মাঝে আমরা বিচরণ করছি।

আমাদের টিম ৫ মিনিট বিশ্রামের পর অনুমতি সাপেক্ষে নেতাসহ অন্য ৮ জনকে যে জায়গায় দাহ করা হয়েছে সেই জায়গাটা দেখার জন্য আমরা সবাই সেখানে যাই। গিয়ে দেখি কিছুই নাই, সব আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। সকলে এক মিনিট নিরবতা পালন করার পর সামরিক কায়দায় সম্মান জানিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় ফিরে আসি।  

সেদিন অর্থাৎ ১২ই নভেম্বর বাঘমারায় অবস্থানরত সকল জুনিয়র ও সিনিয়র কম্যান্ডারদের সমন্বয়ে এক অনাড়ম্বর পরিবেশের মাধ্যমে বর্তমান নেতা শ্রী জ্যেতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমাকে (সন্তু লারমা) পরবর্তী নেতা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত অন্তবর্তীকালীন সময়ের জন্য নেতা হিসেবে মনোনয়ন করা হয়। প্রত্যেককে ২/১ মিনিট করে বক্তব্য দেয়ার সুযোগ দেয়া হয়। প্রত্যেকেই নেতাকে আশ^াস দিলেন এবং প্রতিশ্রুতি দিলেন, যে কোনো মূল্যে বিভেদপন্থীদের ধ্বংস ও নির্মূল করার জন্য যা যা করা প্রয়োজন সব করা হবে। প্রয়োজনে জীবন দিয়ে হলেও তা করতে সকলে প্রস্তুত। এম এন লারমার গদে তোলা জুম্ম জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আন্দোলনকে বৃথা যেতে দেবেন না।

দীর্ঘ কয়েক মাস রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর অবশেষে বিভেদপন্থীরা ২৯ এপ্রিল ১৯৮৫ তারিখে সরকারের কাছে আত্মসমর্পনের মাধ্যেমে গৃহযুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে।প্রয়াত মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ছিলেন বাংলাদেশের একজন মহান নেতা যিনি ১৯৭২ এর সংবিধানের উপর সংসদে আলোকপাত করার সময় রিকশাওয়ালা, জেলে, কামার, কুমার, কৃষক, পতিতা, তাঁতীসহ সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশের মানুষদের দুঃখের কথা সংবিধানে প্রতিফলিত করার দাবি জানান। অন্য কোন নেতা সাধারণ খেটে খাওয়া দুঃখী মানুষের কথা এভাবে বলেছেন কিনা আমার জানা নেই।

আমরা জানি, ১৭৫৭ সালের ২৩ শে জুন পলাশী যুদ্ধে নবাব সিরাজ উদ্দৌলাকে পরাজিত করে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। ব্রিটিশদের এই ষড়যন্ত্রের কাছে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেন নবাব সিরাজ উদ্দৌলার প্রধান সহচর মীরজাফর ও তার অনুচরেরা। সেদিন তারা বিশ^াসঘাতকতা করেছিল। ঐ চক্রান্তের ফলে সেদিন বাংলার সূর্য অস্তমিত হয়ে যায়। পৃথিবীর ইতিহাসে নতুন করে অভিধানে ঘৃনাক্ষরে যুক্ত হলো একটি শব্দ “মীরজাফর”। ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না।

যেভাবে হোক পাপের প্রায়শ্চিত্ত অবশ্যই ভোগ করতে হয়, তা অবধারিত। জীবদ্দশায় মীরজাফর ও তার অনুচরদের কি করুণ পরিণতি হয়েছিল, তা আমরা জানি। অনুরূপভাবে ক্ষমতার লোভে মদমত্ত হয়ে উচ্চাভিলাষী  গিরি-প্রকাশ-দেবেন-পলাশ চক্রান্তকারীদের বিশ্বাসঘাতকতামূলক অতর্কিত আক্রমণের মাধ্যমে সেদিন ১০ই নভেম্বর ১৯৮৩ সালে প্রয়াত নেতাসহ ৮ জন বিপ্লবীকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। পার্ব্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে নতুন করে সংযোজিত হলো আরও একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়। পার্Ÿত্য চট্টগ্রামের আন্দোলনের ইতিহাস ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানবে ও পড়বে। আজ ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে ষড়যন্ত্রকারী গিরি-প্রকাশ-দেবেন-পলাশ চক্র। মীরজাফরদের যে পরিণতি হয়েছিল এদেরও বরণ করতে হয়েছে সে ধরনের করুণ পরিণতি।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত