আজ রবিবার, | ১৯ নভেম্বর ২০১৭ ইং

শিরোনাম

  মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতায় বিশ্বসুন্দরী হলেন ভারতের মেডিক্যালের ছাত্রী মানুসি চিল্লার   অনৈতিক কাজে জড়াচ্ছে রোহিঙ্গা তরুণীরা   ট্রাকের চাপায় বান্দরবানে এক শিক্ষকের মৃত্যু   ১৯৯৩ সালে নানিয়াচর গণহত্যায় নিহতদের স্মরণে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শোকসভা ও মোমবাতি প্রজ্জ্বলন   রাবিতে ছাত্রী অপহরণের ঘটনায় বামপন্থী ও শিক্ষার্থীদের উপাচার্যের বাসভবন ঘেরাও   হিল ভ্যালি প্রোডাকশন নিয়ে এসেছে চাকমা গান   রংপুরে তাণ্ডব: ৭ দিনেও গ্রেফতার হয়নি ‘মূল হোতারা’   রুয়েটে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত   জেএসএস নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক মামলার প্রতিবাদে ঢাকা শাহবাগে বিক্ষোভ মিছিল   রিপনা চাকমা\'র জীবনের গল্প : কৃষ্ণ এম. চাকমা   উ. কোরিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে সিঙ্গাপুর   জেএসএস নেতা কর্মীদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার,ধর-পাকড় ও হয়রানির প্রতিবাদে বিক্ষোভ   রংপুরে সাম্প্রদায়িক তাণ্ডব: ২ ইউপি সদস্য আটক   রুনা লায়লার জন্মদিন আজ   পাকিস্তানে বুদ্ধের ১৭০০ বছরের সবচেয়ে পুরনো মূর্তি উন্মোচন   আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছে সিটি অব অটোয়া   নিউজিল্যান্ডের বিদায়, ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপে পেরু   রেকর্ড দামে বিক্রি ভিঞ্চির চিত্রকর্ম   উস্কানিমূলক লিফলেট বিতরণকালে ৪ রোহিঙ্গা আটক   বৃষ্টি হতে পারে আরো ২ দিন

দ্য গ্রেটকোট-৩

নিকোলাই ভাসিলিয়েভিচ গোগোল রবার্ট শ্যান্ডলারের ইংরেজি অনুবাদ থেকে কাজী মাহবুব হাসান

প্রকাশিত: ২০১৭-০২-০৭ ২২:২২:২২

ডেইলি সিএইচটি ডেস্ক

অবশেষে একদিন … খুব কঠিন হবে সঠিক করে বলা ঠিক কোনদিন, তবে সম্ভবত সেটাই ছিল আকাকি আকাকিয়েভিচের জীবনের সবচেয়ে সুন্দরতম দিন, কারণ পেত্রোভিচ তার নতুন গ্রেটকোটটি নিয়ে এসেছিল সেদিন। সকালে, ঠিক যখন কাজে যাবার জন্য তিনি বের হচ্ছিলেন, তখনই পেত্রোভিচ তার নতুন গ্রেটকোটটি নিয়ে এসেছিল। আর গ্রেটকোটটি নিয়ে আসার জন্য এর চেয়ে ভালো আর কোনো সময়ও হতে পারেনা, কারণ শীতের তীব্রতা কেবল শুরু হয়েছে, এবং আরো তীব্র হবে এমনিই হুমকি দিচ্ছে। এমন সময় পেত্রোভিচ তার গ্রেটকোটটি নিয়ে হাজির হয়েছিলেন যেমন কোনো ভালো দর্জি করে থাকেন। পেত্রোভিচের চেহারায় গুরুত্বপূর্ণ কিছুর এমন একটি অর্থপূর্ণ অভিব্যক্তি ছিল যা আকাকি আকাকিয়েভিচ এর আগে কখনোই দেখেননি। স্পষ্টতই খুব ভালো করে তিনি জানতেন এটা কোনো সামান্য অর্জন নয় এবং হঠাৎ করেই যেন তার ব্যক্তিত্বে সে প্রকাশ করছিল সেই বিশাল ব্যবধানটি, যা বিভাজিত করে শুধু কাপড় টুকিটাকি ঠিক করা কিংবা ভিতরে আস্তরণ লাগানো দর্জিদের থেকে সব দর্জিদের, যারা নতুন কাপড় কেটে সম্পূর্ণ জামা তৈরি করেন। 

পেত্রোভিচ বড় একটা রুমালের আবরণ থেকে গ্রেটকোটটা বের করেন, যা দিয়ে তিনি এটি ঢেকে নিয়ে এসেছিলেন, সেই  রুমালটি কেবলই ধোপার বাড়ি থেকে এসেছে, খুব ভালো করে ভাজ করে পেত্রোভিচ সেটি তার পকেটে রেখে দেন পরে তার নাকের জন্য ব্যবহার করার উদ্দেশ্যে। গ্রেটকোটটি বের করার পর, অনেক গর্বের সাথে তিনি সেটির দিকে তাকান, আর দুই হাতে সেটি তুলে ধরেন, এরপর পেত্রোভিচ খুব দক্ষতার সাথে আকাকি আকাকিয়েভিচের কাঁধের উপর সেটি বিছিয়ে দেন, তারপর বেশ আত্মবিশ্বাসী লঘুচিত্ততার সাথে নীচের দিকে একটি হ্যাঁচকা টান দিয়ে আকাকি আকাকিয়েভিচের পিঠের উপর ঠিক মত ছড়িয়ে দেন কোটটি, কেপ বা লম্বা ঝোলানো কাপড়ের মত। আকাকি আকাকিয়েভিচ আর যেহেতু অল্পবয়সী নন, তিনি সঠিকভাবে সেটি গায়ে পরে দেখতে চেয়েছিলেন। পেত্রোভিচ তাকে সাহায্য করেন জামার আস্তিনে হাত ঢোকানোর জন্য- ঠিক মাপমতই হয় সেটি। এককথায় গ্রেটকোটটি নিখুঁত আর সঠিকভাবে তার শরীরে সাথে মানানসই হয়। পেত্রোভিচও বিরত থাকেননি বিষয়টি উল্লেখ করতে যে, যেহেতু তিনি একটি ছোট রাস্তায় কোনো সাইনবোর্ড ছাড়া বাস করেন আর যেহেতু আকাকি আকাকিয়েভিচকে তিনি দীর্ঘদিন ধরে চেনেন, সে কারণে তিনি খুব কম পারিশ্রমিক দাবী করেছেন। নেভস্কি প্রসপেক্টে আকাকি আকাকিয়েভিচকে পঁচাত্তর রুবল দিতে হতো শুধুমাত্র সেলাইয়ের কাজটি করার জন্য। আর এই বিষয়টি নিয়ে আকাকি আকাকিয়েভিচ পেত্রোভিচের সাথে আলোচনা করতে চাননি। কারণ তিনি ভয় পেয়েছিলেন এত বড় অংক শুনে, যা পেত্রোভিচের জিহ্বা থেকে বের হয়ে এসেছিল যখন তিনি তাকে তার দক্ষতা দেখিয়ে মুগ্ধ করার চেষ্টা করছিলেন।

আকাকি আকাকিয়েভিচ পেত্রোভিচের সাথে তার হিসাব মিটিয়ে ফেলেন, তাকে ধন্যবাদ জানান, এবং সাথে সাথে তার বিভাগের দিকে রওনা দেন তার নতুন গ্রেটকোটটি পরে। পেত্রোভিচও তাকে অনুসরণ করে বের হয়ে আসেন, তিনি রাস্তায় কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থাকেন, দূর থেকে তারা বানানো গ্রেটকোটটি দেখার জন্য। তারপর একটি আঁকাবাঁকা ঘুরপথে তিনি হেটে আসেন, যেন তিনি আকাকি আকাকিয়েভিচকে অতিক্রম করে যেতে পারেন। রাস্তায় তার সামনে দৌড়ে যান, তার বানানো গ্রেটকোটটি আবার দেখার জন্য। এবার অন্যদিক থেকে, সেটি হলো, সরাসরি মুখোমুখি। অন্যদিকে আকাকি আকাকিয়েভিচ হাটছিলেন পুরোপুরি উৎসবের আনন্দময় মেজাজে। প্রতিটি মুহূর্তে তিনি তার নতুন গ্রেটকোটটিকে তার কাঁধের উপর অনুভব করছিলেন, এবং বেশ কয়েকবার তার মনের সন্তুষ্টিতে তিনি আপনমনে হাসেনও। কোটটি, আসলেই দ্বিগুণ সুবিধাজনক: প্রথমত, এটি উষ্ণ, দ্বিতীয় একটি ভালো। আদৌ তিনি খেয়াল করেননি অফিস অভিমুখে তার যাত্রাপথের দূরত্বটি, এবং, হঠাৎ করেই, তিনি নিজেকে তার বিভাগীয় দপ্তরে আবিষ্কার করেন। সামনের অভ্যর্থনা কক্ষে তার গ্রেটকোটট খুলে রাখেন তিনি, আবার ভালো করে লক্ষ্য করেন, এবং পাহারাদারের বিশেষ সুরক্ষায় সেটি রেখে আসেন। 

ঠিক কিভাবে হয়েছিল সেটি অজানা, কিন্তু হঠাৎ করে বিভাগের সবাই জানতে পারেন যে, আকাকি আকাকিয়েভিচ নতুন একটি গ্রেটকোট সেলাই করিয়েছে, তার সেই অতি-ব্যবহারে জীর্ণ ‘ড্রেসিং গাউনটি’ আর নেই। সাথে সাথেই তারা সবাই দৌড়ে যান অভ্যর্থনা কক্ষে রাখা আকাকি আকাকিয়েভিচের নতুন গ্রেটকোটটি দেখতে। তারা সবাই তাকে সম্ভাষণ আর শুভেচ্ছা জানান, তিনি তার উত্তরে মৃদু হাসা ছাড়া আর কিছু করতে পারেন না, তারপর তিনি লজ্জা পেতে শুরু করেন। যখন সবাই তাকে ঘিরে ধরে এবং বলতে থাকে যে তার নতুন গ্রেটকোটটিকে অবশ্যই দীক্ষিত করতে হবে, আর কমপক্ষে তিনি যা করতে পারেন তা হলো সবাইকে নিমন্ত্রণ করে খাওয়াতে হবে। আকাকি আকাকিয়েভিচ পুরোপুরি হতবাক হয়ে পড়েন, কোনো ধারণাই ছিল না তার কি করবেন সেই পরিস্থিতিতে, এর উত্তর দেবেন কিভাবে, কিভাবে নিজেকে এই সমস্যা থেকে বাঁচাতে ক্ষমাপ্রার্থনা করবেন। কয়েক মিনিট পর, লজ্জায় লাল হয়ে, সবাইকে সরলভাবে তিনি আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন এই বলে যে, এটি আসলে নতুন গ্রেটকোট না, এটি শুধুমাত্র, শুধুমাত্র পুরোনো একটা গ্রেটকোট। 

অবশেষে একজন কর্মকর্তা, সম্ভবত প্রধানের সহকারী – যিনি সম্ভবত দেখাতে চাইছিলেন, তিনি নিজে কোনো ভাবেই নাক উঁচু কেউ নন, এমনকি তার অধস্তন কর্মকর্তাদের সাথেও তিনি স্বাচ্ছন্দ্যে মেলামেশা করেন, তিনি বললেন, ‘বেশ তবে তাই হোক, আমি আকাকি আকাকিয়েভিচের পক্ষ হয়ে সবাইকে নিমন্ত্রণ দিচ্ছি, আমি আপনাদের নিমন্ত্রণ করছি আমার সাথে রাতে খাবার জন্যে। সৌভাগ্যক্রমে ও ঘটনাচক্রে, আজ আমার জন্মদিনও’। কেরানিরা অবশ্যই, সবাই একই সাথে শুভেচ্ছা জানান প্রধানের সহকারীকে ও তারা সেই নিমন্ত্রণ গ্রহণ করলেন খুবই আগ্রহের সাথে। আকাকি আকাকিয়েভিচ অবশ্য সেখানে না যাবার জন্য অজুহাত উপস্থাপন করতে শুরু করেছিলেন, কিন্তু উপস্থিত সবাই তাকে মনে করে দেয়, এমন কিছু করা খুবই অভদ্রতা হবে, বেশ কয়েকবার আওয়াজও শোনা যায়, ‘খুব লজ্জার ব্যাপার!, খুব লজ্জার ব্যাপার!’ সুতরাং নিমন্ত্রণটি প্রত্যাখ্যান করা তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছিল । 

পরে, যদিও তিনি বেশ সন্তুষ্ট হয়েছিলেন অনুধাবন করে যে, এবার তিনি সন্ধ্যায় তার গ্রেটকোটটি পরে হাটতে বের হতে পারবেন। আকাকি আকাকিয়েভিচের জন্য সেই দিনটি ছিল অত্যন্ত সুন্দর কোনো ছুটির দিনের মত। খুবই আনন্দপূর্ণ মেজাজ নিয়ে তিনি বাসায় ফিরেছিলেন সেদিন। তার গ্রেটকোটটি খুলে, দেয়ালে খুব সযত্নে ঝুলিয়ে রাখেন তিনি, আরো একবার এর কাপড় আর ভিতরের সেলাইয়ের প্রশংসা করেন তিনি, আর তারপর তুলনা করার উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি তার পুরোনো ‘ড্রেসিং গাউনটি’ বের করেন। যা এখন প্রায় পুরোটাই নানা জায়গায় পাতলা হয়ে ছিঁড়ে গেছে। সেদিকে একবার তাকিয়ে এমনকি তিনি হাসতে শুরু করেন: দুটির মধ্যে পার্থক্য কত বিশাল। আর অনেক সময় পরে, খাবার সময়ও, তিনি মনে মনে হাসছিলেন যখনই ড্রেসিং গাউনটির বর্তমান অবস্থার কথা তার মনে পড়েছে। খুব সতর্কতার সাথে তিনি কিছু খেয়ে নিলেন এবং খাবারের পর তিনি আজ আর কিছু লিখলেন না, একটি কাগজও না; বিলাসীভাবে তিনি তার বিছানায় কিছুক্ষণ শুয়ে থাকেন, যতক্ষণ না সন্ধ্যা হয়। তারপর, আর সময় নষ্ট না করে, তার গ্রেটকোটটি পরে রাস্তায় বের হন।  ঠিক কোথায় সেই সরকারী কর্মকর্তাটি বাস করেন যিনি তাকে নিমন্ত্রণ করেছেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমি সেটি বলতে পারবো না। আমাদের স্মৃতি ভয়ানকভাবে আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে শুরু করেছে, আর পিটার্সবুর্গে কোনো কিছু খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন যেখানে প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি বাড়ি, সব মিলে মিশে আর অস্পষ্ট হয়ে গেছে আমাদের মস্তিষ্কে; সুশৃঙ্খল কোনো উপায়ে আমরা আদৌ কিছু মনে করতে পারবো না সেখানে থেকে। 

তবে যাই হোক না কেন, অন্তত নিশ্চিতভাবে বলা যেতে পারে বড় সরকারী কর্মকর্তারা সবাই শহরের উত্তম অংশে বাস করতেন, আর সেকারণে জায়গাটি অবশ্যই আকাকি আকাকিয়েভিচের যেখানে থাকেন, তার খুব কাছাকাছি কোথাও নয়। প্রথমে আকাকি আকাকিয়েভিচকে জনশূন্য রাস্তা পার হতে হয় বেশ কিছু, যেখানে খুব সামান্যই আলো জ্বলছিল, কিন্তু যখনই তিনি সরকারী কর্মকর্তার বাসার কাছাকাছি অগ্রসর হতে থাকেন, রাস্তাও ক্রমশ আরো প্রাণবন্ত, জনাকীর্ণ হয়ে উঠতে শুরু করে, এবং আরো বেশী আলোকোজ্জ্বলও হয়ে ওঠে। পথচারীরা আরো নিয়মিত, সুন্দর কাপড় পরা রমণীদের সেখানে দেখা যায়, আর সেখানে বিভার (১৮) কলার ক্রমশ আবির্ভূত হতে থাকে পুরুষদের শরীরে, কৃষকদের পেরেক দিয়ে আটকে রাখা কাঠের তক্তার ঠেলাগাড়ি অনেক কম দেখা যেতে থাকে, বরং সেখানে দেখা যায়, লাল ভেলভেটের টুপি পরা কোচওয়ান, সোনালী চকচকে শ্লেড গাড়ীগুলো; ভালুকের চামড়ার কার্পেট আর ডোরা কাটা কাপড়ে মোড়া সেই গাড়িগুলো রাস্তা দিয়ে গড়াতে গড়াতে যাচ্ছে বরফের উপর তাদের চাকার শব্দ তুলে। আকাকি আকাকিয়েভিচ এইসব কিছু এমনভাবে দেখছিলেন যেন এরকম আর কিছু তিনি কোনোদিনও দেখেননি। বেশ কয়েক বছর হলো তিনি সন্ধ্যার পর বের হয়েছেন রাস্তায়। 

কৌতূহল নিয়ে তিনি একটি আলোকোজ্জ্বল দোকানের জানালার সামনে এসে দাঁড়ান, খুব সুন্দরী একটি রমণী তার জুতো খুলছে এমন একটি চিত্রকর্ম দেখতে, ছবিতে রমণীর পুরো পা নগ্ন, খুব চমৎকার তার গড়ন, আর তার পেছনে জুলফি আর থুতনিতে পরিপাটি ইমপেরিয়াল শৈলীর দাড়িসহ একজন ভদ্রলোক দরজা দিয়ে উকি দিচ্ছেন। আকাকি আকাকিয়েভিচ তার মাথা নাড়ান ও হাসেন, তারপর তার গন্তব্য বরাবর হাটতে শুরু করেন। কেন তিনি হেসেছিলেন? হয়তো এর কারণ তিনি এমন কিছু দেখেছেন যার সাথে তিনি বেশ অপরিচিত, কিন্তু সেটির জন্য আমাদের সবারই, যাই হোক না কেন, কিছু না কিছু প্রবৃত্তিগত অনুভূতি আছে, অথবা এর কারণ অন্য অনেক কেরানির মত তিনি ভেবেছিলেন, ‘বেশ, আসলেই এই ফরাসী পুরুষগুলো, আর কি বলার আছে? যখন তারা কিছু চায়, পাগল হয়ে যায়, যেমন ঠিক যেন, ইয়ে, আসলে, ইয়ে…’। অথবা তিনি হয়তো এমন কিছু চিন্তাও করেননি –  যাই হোক এমন তো নয় যে, আপনি একটি মানুষের আত্মায় প্রবেশ করতে পারবেন আর তার সব চিন্তার কথাও জানতে পারবেন। 

অবশেষে তিনি সেই ভবনটির কাছে পৌঁছান, যেখানে প্রধানের সহকারী বাস করেন। প্রধানের সহকারী বেশ বিলাসিতার সাথেই বসবাস করতেন: দোতালায়। তার বাসায় উপরে ওঠার সিঁড়ির পথটি বেশ আলোকিত, সামনের ঘরটিতে ঢোকার পর আকাকি আকাকিয়েভিচ এক সারি গালোশ বা রাবারের জুতা দেখতে পান, এই সারিগুলোর মধ্যে, ঘরের মাঝখানে, একটি সামোভার (১৯) রাখা, হিস হিস শব্দ করে সেটি বাষ্পের মেঘ উগরে দিচ্ছে। পুরো দেয়াল জুড়ে ঘন হয়ে ঝুলে আছে বহু গ্রেটকোট আর ক্লোক, তাদের কোনো কোনোটার বিভার অথবা ভেলভেটের কলারও আছে। দেয়ালের পিছন থেকে আসা একটি সাধারণ হট্টগোলের আওয়াজও তিনি শুনতে পান, যা হঠাৎ করেই স্পষ্ট ও আরো তীব্র হয়, যখন দরজাটি খুলে যায় আর খালি গ্লাস সাজানো একটি ট্রে , ক্রিম ভরা একটি জগ আর বিস্কুটের একটি ঝুড়িসহ একজন গৃহভৃত্য বের হয়ে আসেন সেই ঘরটি থেকে। স্পষ্টতই কেরানিরা সবাই সেখানে এসেছেন বেশ অনেকক্ষণ আগে এবং ইতিমধ্যেই তারা তাদের প্রথম গ্লাস চাও পান করে ফেলেছেন। 

আকাকি আকাকিয়েভিচ, তার নিজের গ্রেটকোটটি দেয়ালে সাবধানে ঝুলিয়ে রাখার পর সেই ঘরটিতে প্রবেশ করেন, এবং তার চোখের সামনে একসাথে হঠাৎ করে আবির্ভূত হয় মোমবাতি, কেরানিরা, পাইপ, তাস খেলার টেবিল, আর কানের উপর হামলে পড়ে কথোপকথনের নানা সোরগোল, এদিক ওদিক চেয়ার সরানোর শব্দ,  চারিদিক থেকে যে শব্দগুলো ভেসে আসছিল; রুমের মাঝখানে বেশ অপ্রস্তুত হয়ে দাড়িয়ে থাকেন তিনি, চারপাশে তাকিয়ে চেষ্টা করেন ভাবতে কি করা যেতে পারে। কিন্তু তাকে অন্যরা লক্ষ্য করেছিলেন, সবাই উচ্চস্বরে তাকে শুভেচ্ছা জানান, এবং একসাথে সবাই আবার বাইরের রুমে এসে তার গ্রেটকোটটি পরীক্ষা করেও দেখেন। আকাকি আকাকিয়েভিচ কিছুটা বিব্রত হন, কিন্তু তারপরও, সরলমনা হবার কারণে খুশি না হয়ে পারছিলেন না যেভাবে সবাই তার গ্রেটকোটটির প্রশংসা করছিলেন। তারপর, অবশ্যই, সবাই তাকে ও তার গ্রেটকোটটিকে ছেড়ে মনোযোগ দেয়, স্বাভাবিকভাবেই, হুইস্ট তাস খেলার টেবিলের দিকে। এইসব -  আওয়াজ, কথাবার্তা, মানুষের অতি ভিড়  সবকিছু আকাকি আকাকিয়েভিচের কাছে খুব বেশী অদ্ভুত মনে হয়। আসলেই তার জানা ছিল না তিনি কি করবেন সেখানে, কোথায় তিনি তার হাত, পা বা পুরো শরীরটাকে রাখবেন । অবশেষ তিনি একটি তাসের টেবিলে এসে বসেন, কার্ডের দিকে তাকান, একটার পর একটা মুখের দিকে গভীরভাবে তাকান, কিন্তু কিছুক্ষণ পরই  তিনি হাই তুলতে আর ক্লান্তি অনুভব করতে শুরু করেন আরো বেশী করে কারণ ততক্ষণে অনেক আগেই পার হয়ে গেছে সেই সময়, যখন তিনি সাধারণত ঘুমানোর জন্য বিছানায় শুয়ে পড়েন। তিনি সেখান থেকে বাড়ি ফিরতে চান বিদায় নিয়ে, কিন্তু অন্যরা তাকে বাধা দেন, তারা বলেন নতুন গ্রেটকোটের সম্মানে তাকে অবশ্যই শ্যাম্পেন পান করতে হবে। 

এক ঘণ্টা পর রাতের খাবার পরিবেশন করা হয়: রুশ সালাদ, ঠাণ্ডা বাছুরের মাংস, পাতে বা মাংসের কিমার পেস্ট, মিষ্টি পেস্ট্রি আর শ্যাম্পেন। আকাকি আকাকিয়েভিচকে দুই গ্লাস শ্যাম্পেন পান করতে বাধ্য করা হয়, এরপর পুরো ঘরটি আরো বেশী যেন আনন্দময় হয়ে উঠেছিল তার কাছে। কিন্তু তিনি ভুলতে পারেননি যে তখন রাত বারোটা বাজে, তার বাড়ি ফেরা কথা ছিল আরো অনেক আগে। তাকে যেন বাড়ির কর্তা আর আটকে রাখতে না পারেন, তিনি কাউকে কিছু না বলেই ঘর থেকে বের হয়ে আসেন, সামনের ঘরে এসে তার গ্রেটকোটটি খোঁজেন, আক্ষেপসহ লক্ষ্য করেন, সেটি মেঝেতে পড়ে আছে। শেষ ময়লাটুকু সরানোর জন্য গ্রেটকোটটিকে ভালো করে অনেকক্ষণ ধরে ঝেড়ে নেন তিনি, তারপর সেটি গায়ে পরে নিয়ে নীচে নেমে এসে রাস্তায় বের হয়ে আসেন। 

তখনও বাইরে আলো জ্বলছে। অল্প কিছু ছোট মুদির দোকান– গৃহভৃত্য ও নানা ধরনের মানুষদের সর্বক্ষণ মিলিত হবার স্থান – তখনও খোলা ছিল, আর এমনকি যেগুলো বন্ধ, সেগুলোর দরজার পাল্লা অবধি আলোর লম্বা ফালি, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে সেগুলো এখনো পুরোপুরি পরিত্যক্ত হয়নি, আর গৃহভৃত্য কর্মচারীরা সম্ভবত এখনও তাদের গল্প আর আলোচনার জাল বুনছে, তাদের বিস্মিত মনিবদের কারোরই হয়তো জানা নেই এখন তারা ঠিক কোথায়। বেশ আনন্দপূর্ণ মেজাজ নিয়ে আকাকি আকাকিয়েভিচ হাটছিলেন। তিনি এমনকি প্রায় দৌড়াতে শুরু করেছিল, কোনো এক অজানা কারণে, যখন তার পাশ দিয়ে বিদ্যুৎচমকের মত একজন মহিলা অতিক্রম করেছিল, যার শরীর পূর্ণ অসাধারণ গতিময়তায়। তবে আবারো তিনি হঠাৎ করেই ধীরে চলতে শুরু করেন, আগের মন্থর গতি আবারো ফিরে আসে তার হাটায়, , হঠাৎ করে তার মধ্যে প্রাণশক্তির আগমন লক্ষ্য করে অন্য যে কারো মতই বিস্মিত হন তিনি, যেন সেটি এসেছে অন্য কোনো জায়গা থেকে।

শীঘ্রই তিনি সেই দীর্ঘ আর পরিত্যক্ত রাস্তাটিকে চলে আসেন, সকাল বেলার মত উচ্ছলতা আর সেখানে অবশিষ্ট নেই, এমনকি সন্ধ্যার সেই কোলাহলও নেই। এখন সেই রাস্তা আরো বেশী নীরব আর নির্জন। রাস্তার বাতির সংখ্যাও অপেক্ষাকৃত কম আর তাদের অবস্থানও বহু দূরে দূরে। তেলের সরবরাহ কম আছে নিশ্চয়ই। রাস্তার পাশে বাসা আর তাদের প্রাচীরগুলো এখন কাঠের তৈরি, কাউকে কোথাও দেখা যায় না। কোনো আলো নেই রাস্তার বরফ থেকে আসা আভা ছাড়া। নিচু ঘুমন্ত কুটিরগুলো তাদের বন্ধ জানালাসহ দেখতে বিষণ্ণ আর কালো। তিনি এখন সেই জায়গাটির কাছে, যেখানে রাস্তায় বিরতি সৃষ্টি করেছে প্রায় অশেষ একটি চত্বর, যার দূর প্রান্তের বাড়িগুলো প্রায় অদৃশ্য, দেখলে মনে হয় যেন ভয়ঙ্কর কোনো মরুভূমি।   

বহু দূরে, ঈশ্বরই জানেন কোথায়, নৈশ প্রহরী পুলিশদের একটি ঘর থেকে আলোর অস্পষ্ট আভা দেখা যায়, মনে হয় যেন সেটি দাড়িয়ে আছে দূর পৃথিবীর প্রান্তে। এখানে, কোনো না কোনোভাবে, আকাকি আকাকিয়েভচের মেজাজে উৎফুল্লতা লক্ষণীয়ভাবে হ্রাস পায়। তিনি চত্বরে পা রাখেন, খানিকটা তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে অনৈচ্ছিক ভয় সহ, যেন তার তার হৃদয় খারাপ কিছু ঘটার অমঙ্গল একটি আশংকা করছে। তিনি চারিদিকে তাকিয়ে দেখেন, যেন চারদিকে বিস্তৃত হয়ে আছে একটি সাগর। ‘না, না তাকানোই উত্তম,’ তিনি ভাবেন, তার চোখ বন্ধ করেই তিনি হাটতে থাকেন, আর যখন তিনি চোখ খুলেছিলেন দেখার জন্য যে চত্বরের শেষ প্রান্তটি এখনও অনেক দূরে কিনা, ঠিক তার সামনে, একেবারে নিজের নাকের সামনে তিনি যা দেখেছিলেন তা হলো, গোঁফওয়ালা কয়েকজন লোক দাড়িয়ে আছে। কিন্তু কি ধরনের লোক ছিল তারা সেটি তিনি শনাক্ত করতে পারেননি। তার চোখের দৃষ্টি হঠাৎ ঝাপসা হয়ে ওঠে,  কেউ তার বুকের উপর যেন সজোরে আঘাত করছে, তার কলার চেপে ধরেছে, ‘আরে এই গ্রেটকোটটা আমার!’, বজ্রপাতের মত কণ্ঠস্বরে তাদের একজন চিৎকার করে বলে। আকাকি আকাকিয়েভিচ প্রায় চিৎকার করার উপক্রম হয়েছিলেন, ‘বাঁচাও’, আর তখনই অন্য একজন, কোনো কেরানির মাথার মত বড় হাতের মুষ্টি তার মুখের ঠিক উপরে এনে বলে, ‘চিৎকার করার চেষ্টা করলে কিন্তু।’ আকাকি আকাকিয়েভিচ শুধু অনুভব করেছিলেন কেউ তার গা থেকে গ্রেটকোটটি খুলে নিচ্ছে, তারপর হাঁটু দিয়ে তারা তাকে একটা আঘাত করে, যা ফলে তিনি বরফের মধ্যে চিৎ হয়ে পড়ে যান, আর কিছুই তিনি অনুভব করতে পারেন না। 

কয়েক মিনিট পর তিনি জ্ঞান ফিরে পান, পায়ের উপর ভর করে উঠে দাঁড়ান, কিন্তু কাউকেই আর দেখা যায় না আশে পাশে, কোনো গ্রেটকোট ছাড়া এমন উন্মুক্ত জায়গায় তিনি তীব্র ঠাণ্ডা অনুভব করেন, আর তিনি চিৎকার করার চেষ্টা করেন, কিন্তু স্পষ্টতই তার কণ্ঠস্বরটির চত্বরের অন্য প্রান্ত অবধি অতিক্রম করার সামান্যতম ইচ্ছাও ছিল না।  

মরিয়া হয়ে তিনি ক্রমাগত চিৎকার করতে করতে পুলিশের ছাউনি অভিমুখে চত্বরের মধ্যে দিয়ে দৌড়ে যান, ছাউনির পাশে দাড়িয়ে ছিল একজন পুলিশ তার হাতিয়ারে হেলান দিয়ে এবং স্পষ্টতই কৌতূহলের সাথে পুলিশ প্রহরীটি লক্ষ্য করছিলেন, তিনি ভাবছিলেন কেন দূর থেকে একটি মানুষ তার দিকে চিৎকার করে দৌড়ে আসছে। আকাকি আকাকিয়েভিচ দৌড়ে তার কাছে যান, শ্বাস বন্ধ হবার উপক্রম তার, তারপরও তিনি  চিৎকার করতে থাকেন, কেন পুলিশ প্রহরীটি ঘুমাচ্ছিল, যখন তার কিনা পাহারা দেবার কথা? কেন সে দেখেনি একটি মানুষকে ছিনতাই করা হয়েছে? পুলিশটি উত্তর দেয় সে কিছুই দেখেনি, তবে দুজন মানুষকে আকাকি আকাকিয়েভিচের দিকে হেটে যেতে দেখেছিল চত্বরের মাঝখানে, কিন্তু সে ভেবেছে তারা হয়তো পরস্পরের পরিচিত, তাকে বিনা কারণে গালমন্দ না করে প্রহরীটি আকাকি আকাকিয়েভিচকে পরের দিন সার্জেন্টের সাথে দেখা করার জন্য পরামর্শ দেয়, নিশ্চয়ই সার্জেন্ট খুঁজে বের করবেন কে তার গ্রেটকোটটি ছিনতাই করেছে। ভয়ঙ্কর শোচনীয় এক পরিস্থিতিতে আকাকি আকাকিয়েভিচ তার ঘর অবধি দৌড়ে আসেন, তার মাথায় যা সামান্য চুল অবশিষ্ট ছিল পেছনে ও দুপাশে পুরোপুরিভাবে সেগুলো ভেজা আর এলোমেলো, বুকে, পাশে ও পায়ে, তার সারা শরীর তার বরফে মাখামাখি।

দরজায় তীব্র আর ভীতিকর ধাক্কার আওয়াজ শুনে তার বৃদ্ধ বাড়িওয়ালী লাফ দিয়ে বিছানা থেকে উঠেছিলেন,  বুকের উপর ভদ্রতার জন্য একটি চাদর চেপে ধরে একহাতে, এক পায়ে স্যান্ডেলসহ তিনি দৌড়ে নীচে নেমে এসে দরজা খোলেন, কিন্তু দরজা খুলে যে অবস্থায় তিনি আকাকি আকাকিয়েভিচকে দেখেন, হতবাক হয়ে পেছনে সরে আসেন। যখন আকাকি আকাকিয়েভিচ তাকে বলেন কি ঘটেছে তার সাথে, হতাশ হয়ে তিনি দুই হাত উপরে তুলে বলেন যে, তার সরাসরি ডিসট্রিক্ট সুপারিন্টেনডেন্টের কাছেই যাওয়া উচিৎ। স্থানীয় সার্জেন্ট তাকে নিশ্চিত ঠকাবে, এমন কি তিনি নিজেও তাকে চেনেন। কারণ আনা, যে ফিনল্যাণ্ডবাসী মহিলাটি তার জন্য রান্না করতো একসময়, তাকে তিনি কাজে নিয়েছেন তার বাচ্চাদের দেখাশুনা করার জন্য, প্রায়ই তাকে তাদের বাসার সামনে দিয়ে যেতে দেখেন, আর তিনি প্রতি রোববারে চার্চেও আসেন। যেখানে তিনি  প্রার্থনা করেন আর একই সাথে সবার দিকে ভালোভাবে তাকানও, আর এটাই প্রদর্শন করে তিনি নিশ্চয়ই একজন ভালো মানুষ। এই বিচার শুনে আকাকি আকাকিয়েভিচ তার বিষণ্ণ শরীরটাকে তার ঘরের দিকে টেনে নিয়ে যান আর কিভাবে তিনি তার রাতটি কাটিয়েছিলেন সেটি অবশ্যই ছেড়ে দিতে হবে তাদের কল্পনার উপর যারা অন্যদের অনুভূতির মধ্যে খানিকটা প্রবেশ করার ক্ষমতা রাখেন। 

পরের দিন খুব সকালে উঠেই তিনি সুপারিন্টেনডেন্টের সাথে দেখা করতে যান কিন্তু তাকে জানানো হয় যে, তিনি তখনও ঘুমাচ্ছেন। সকাল দশটার দিকে তিনি আবারো তার কাছে যান, আবারো তাকে বলা হয় যে তিনি ঘুমাচ্ছেন। আবারো এগারোটার দিকে তিনি সেখানে দেখা করতে যান, এবার তাকে বলা হয় তিনি বাইরে বের হয়ে গেছেন। দুপুরে খাবারের সময় আবার সেখানে হাজির হন তিনি, কিন্তু অভ্যর্থনা কক্ষে বসে থাকা কেরানিরা কোনোভাবেই তাকে ভিতরে ঢুকতে দেয় না, এবং তারা জানতে চান, কেন তিনি এসেছেন, কোন কাজে নিয়ে তিনি সেখানে হাজির হয়েছেন, কি ঘটেছে ? সুতরাং, অবশেষে, জীবনে প্রথম ও একবারের মত, আকাকি আকাকিয়েভিচ দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিলেন যে তিনি যে ধাতু দিয়ে তৈরি সেটি দেখাবেন। তিনি সরাসরি তাদের বলেন, সুপারিন্টেনডেন্টের সাথে তার কথা বলতে হবে, শুধুমাত্র তার সাথে। এবং তারা যেন তার সাথে দেখা করা থেকে বিরত করতে কোনো সাহস না দেখায়, তিনি তার বিভাগ থেকে বিশেষ দাপ্তরিক কাজ নিয়ে এসেছেন, এবং তিনি যদি তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগনামা দাখিল করেন তবে তারা নিজেদের সমস্যায় ফেলতে পারে। কেরানিরা এর পরে আর কিছু বলার সাহস পান না, এবং একজন ভিতরে যান সুপারিন্টেনডেন্টকে বাইরে ডেকে আনার জন্য। সুপারিন্টেনডেন্ট বরং বেশ অদ্ভুতভাবে তার প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করেন গ্রেটকোট চুরি হবার ঘটনায়। যা জরুরী সেটি উল্লেখ না করে, তিনি বরং আকাকি আকাকিয়েভিচকে প্রশ্ন করতে শুরু করেন, কেন তিনি এত রাত করে বাড়ি ফিরছিলেন? হয়তো, তিনি কি কোনো, সন্দেহজনক, দুর্নাম আছে এমন কোনো বাড়ি যাননি তো? আর এই প্রশ্নগুলো আকাকি আকাকিয়েভিচ পুরোপুরি সংশয়ে ফেলে দেয়, তার গ্রেটকোটের কেসটি সঠিকভাবে অগ্রসর হচ্ছে কিনা সে বিষয়ে তার স্পষ্টতই কোনো ধারণা ছিলনা। 

সেদিন সারাদিন তিনি বিভাগীয় দপ্তরে অনুপস্থিত ছিলেন ( তার জীবনের প্রথমবারের মত)। পরের দিন তিনি অফিসে আসেন, পুরোপুরি ম্লান বিষণ্ণ তার পুরোনো ‘ড্রেসিং গাউন’ পরে, যা দেখতে আরো বেশী করুণ লাগছিল। যদিও কিছু কেরানি তাকে ঠাট্টা করার এই সুযোগটি হাত ছাড়া করেননি, তবে তার বহু সহকর্মীকে নাড়া দেয় গ্রেটকোট ছিনতাই হবার ঘটনাটি। সাথে সাথেই তারা সিদ্ধান্ত নেন যে তার জন্য একটি তহবিল সংগ্রহ করবেন, কিন্তু তারা খুব সামান্যই সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়, কারণ কেরানিরা ইতিমধ্যে তাদের তহবিল নিঃশেষ করেছে, পরিচালকের একটি প্রতিকৃতির তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ যোগাড় করতে, এছাড়াও, শাখা প্রধানের প্রস্তাবনা অনুযায়ী, যার সাথে লেখকের পরিচিতি আছে, কিছু বই অথবা অন্য কিছুর জন্য অর্থ যোগান দিতেও সেই তহবিল ব্যবহৃত হয়েছে। তাদের একজন, সহমর্মিতায় তাড়িত হয়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় অন্তত আকাকি আকাকিয়েভিচকে ভালো উপদেশ দিয়ে সাহায্য করার জন্য। তাকে তিনি নিষেধ করেন তিনি যেন স্থানীয় সার্জেন্টের কাছে না যান, কারণ যদিও সম্ভব  তিনি উপরের কর্মকর্তাদের সুনজরে পড়ার উদ্দেশ্যে কোনো না কোনো ভাবে গ্রেটকোটটি খুঁজে বের করবেন, তবে গ্রেটকোটটি যাই হোক না কেন পুলিশ স্টেশনেই থাকবে, যদিনা আকাকি আকাকিয়েভিচ সেটির মালিকানার আইনি প্রমাণ দাখিল না করতে পারেন। সেকারণে সবচেয়ে ভালো হবে একজন বিশেষ ‘গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির’ প্রতি আবেদন করা, কারণ এই ‘গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিটি’ প্রয়োজনীয় ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগ ও আলোচনা করে এই কেসটিকে অগ্রসর করতে পারবেন সফলতার সাথে। 
(চলবে)

টিকা:
১৮. বিভার, এক ধরনের প্রাণি, যাদের লোমশ চামড়া ব্যবহার করা হতো কোটের কলার বানানোর জন্য।
১৯. সামোভার, রাশিয়া সহ বেশ কিছু দেশে দেখা যায় ধাতু নির্মিত বড় পাত্র, যেখানে পানি ফোটানো হয়।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত