শিরোনাম

  নৌকার জয় সুনিশ্চিত : প্রধানমন্ত্রী   আজ ইউপিডিএফ’র ২০তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী   এবার থাইল্যান্ডে বৈধ হলো গাঁজা   ইউপিডিএফ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সকলকে সংগ্রামী শুভেচ্ছা জানালেন প্রসিত বিকাশ খীসা   চীনা শিশুরা আর স্কুল পালাতে পারবে না!   আবার ক্ষমতায় গেলে ভুল সংশোধন করা হবে : কাদের   প্রধানমন্ত্রী থেকে মাতৃভাষার বই পেয়েছে ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর শিশুরা   শুভ বড়দিন আজ   রোহিঙ্গাদের জন্য শীতবস্ত্র পাঠাল ভারত   ইন্দোনেশিয়ায় সুনামির আঘাতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪০০ অধিক ছাড়িয়েছে   টাকার মালা উপহার পেলেন ফখরুল!   মধ্যরাত থেকে নির্বাচনী মাঠে সেনাবাহিনী   ভোটের দিন ২৪ ঘণ্টা সব যান চলাচল বন্ধ   সেনা মোতায়েনে ভোটারদের মধ্যে আস্থা ফিরে আসবে: সিইসি   পানছড়িতে ইউপিডিএফের নির্বাচনী অফিসে এলোপাতাড়ি ব্রাশ ফায়ারে ২ জন নিহত!   জেএসসি ও পিইসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ   আগামী ৩০ তারিখ আমরা নৌকার বিজয় নিয়ে ঘরে ফিরবো: দীপংকর তালুকদার   ইন্দোনেশিয়ায় সুনামির আঘাতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২২২ জন   যারা মানুষ পুড়িয়ে মারে তাদের ভোট দেবেন নাঃ প্রধানমন্ত্রী   ২৮ ডিসেম্বর থেকে ১ জানুয়ারি মধ্যরাত পর্যন্ত ৪ দিন মোটরসাইকেল চলাচলে নিষেধাজ্ঞা
প্রচ্ছদ / ফিচার / প্রতিনিধিত্বের সংক্রমণে পাহাড়ের শিক্ষা ধ্বংসের পথে

প্রতিনিধিত্বের সংক্রমণে পাহাড়ের শিক্ষা ধ্বংসের পথে

প্রকাশিত: ২০১৭-০৩-১৭ ১৩:৩৮:৫৪

ডেইলি সিএইচটি ডেস্ক

প্রতি মাসে রাঙামাটির বিভিন্ন উপজেলার বিদ্যালয় থেকে শিক্ষকদের ডেপুটেশনে (সংযুক্তি) রাঙামাটি পৌর শহরের বিদ্যালয়গুলোতে আনছে জেলা পরিষদ। শিক্ষক সংকট নয়, ব্যক্তিস্বার্থে বছরের পর বছর এ কাজ  চলছে। ডেপুটেশনের এই সংক্রমণে ভেঙে পড়েছে দুর্গম উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা।

শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এই অবস্থা চলতে থাকলে পাহাড়ের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে।

ডেপুটেশনে চলে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট স্কুলে তৈরি হচ্ছে শিক্ষক সংকট। তারা তখন শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে চাঁদা তুলে খ-কালীন শিক্ষক রাখে। অথচ এই স্কুলের নামেই বেতন পাচ্ছেন ডেপুটেশনে যাওয়া শিক্ষক।

যেমন বাঘাইছড়ি উপজেলার মাহিল্যা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যলয়। এখানে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা সাড়ে তিন শর বেশি। শিক্ষক পদ আটটি। এর মধ্যে দুজন বদলি হয়ে অন্যত্র চলে গেছেন। দুজন ডেপুটেশনে রাঙামাটি শহরে। একজন পেনশনে গেছেন। একজন প্রশিক্ষণে গেছেন। প্রধান শিক্ষকসহ বাকি আছেন  মাত্র দুজন। চাঁদা তুলে চলছে ওই সরকারি স্কুলে পাঠদান।

আবার যে স্কুলে ডেপুটেশনে যাচ্ছেন শিক্ষকরা, সেখানকার শিক্ষকদের সঙ্গে বনিবনা হচ্ছে না তাদের। অভিযোগ আছে, তারা নিজেদের ইচ্ছামতো স্কুলে আসা-যাওয়া করেন। প্রধান শিক্ষক কিছু বললে, তারা প্রভাবশালীদের ভয় দেখান।

জেলা ও উপজেলা শিক্ষা অফিস বলছে, তারা এ ধরনের ডেপুটেশনের পক্ষে নয়। কিন্তু জেলা পরিষদের চাহিদামতো কাজ করতে হয় তাদের।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্যমতে, গত ডিসেম্বর থেকে চলতি মার্চ পর্যন্ত  তিন মাসে মোট ৪০ জন শিক্ষককে অন্য উপজেলা থেকে রাঙামাটি পৌর এলাকার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে ডেপুটেশনে আনা হয়েছে। এর মধ্যে বরকল উপজেলা থেকে ৯ জন, লংগদু থেকে ৭, বাঘাইছড়ি থেকে ৫, জুরাছড়ি থেকে ৪, রাজস্থলী  থেকে ২, নানিয়াচর ও কাপ্তাই থেকে একজন এবং রাঙামাটি সদরের শহর থেকে দূর এলাকার বিদ্যালয় থেকে ১১ জনকে আনা হয়।

এসব শিক্ষকের মধ্যে পাঁচজনকে নিউ রাঙামাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দেয়া হয়। তাদের একজন হ্যাপী করকে আনা হয়েছে লক্ষ্মীপুর জেলা থেকে।
এ ছাড়া যগনাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৪, স্বর্ণটিলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩,  আসামবস্তি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৪, রাণী দয়াময়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২, গোধুলী আমানতবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২, কাঁঠালতলি বিদ্যালয়ে ২, পুরাণ পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২, দক্ষিণ কুতুকছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২ জন, দক্ষিণ বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২, বিলাইছড়ি পাড়া  সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২ জনকে ডেপুটেশনে আনা হয়। এ ছাড়া একজন করে আনা হয় আরো ১০-১২টি বিদ্যালয়ে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, ডেপুটেশনে যারা আসছেন, তারা সবাই রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করছেন। এমনও উদারহরণ আছে, একজন শিক্ষিকা তার ১২ বছরের কর্মজীবনে মাত্র ছয় মাস ছিলেন কর্মস্থলে। অথচ তিনি সেই কর্মস্থলের নামে বছরের পর বছর বেতন ভোগ করেন।  

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পৌর শহরের এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বলেন, ‘যারা ডেপুটেশনে আমার বিদ্যালয়ে আছেন তারা আমার কথা শোনেন না। একটু চাপ দিলে স্বামী বা তার কোনো আত্মীয়ের রাজনৈতিক ক্ষমতা দেখায়। কিছু বলতে পারছি না, সইতেও পারছি না।’

আরেক প্রধান শিক্ষিকা মজা করে বলেন, ‘ডেপুটেশনে শিক্ষক আসায় আমার দায়িত্ব কিছুটা কমে গেছে। তারা নিজেদের ইচ্ছায় আসছে, যাচ্ছে। আমার কোনো সমস্যা হচ্ছে না, আমি সুখে আছি।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রাঙামাটি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জিল্লুর রহমান বলেন, তিনি ডেপুটেশনের বিপক্ষে। তারা চান পাহাড়ের প্রতিটি শিশু শিক্ষার আলোয় আলোকিত হোক। কিন্তু প্রাথমিক বিভাগটি জেলা পরিষদের হস্তান্তরিত বিভাগ। পরিষদের নির্দেশমতো চলতে হয় তাদের।

জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ডেপুটেশনের অনুমতি দিচ্ছেন দাবি করে রাঙামাটি জেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি অমল চাকমা বলেন, ‘তিনি (চেয়ারম্যান) একের পর এক অনুমতি দিয়ে যাচ্ছেন। এই শিক্ষকরা যে বিদ্যালয়ে নিয়োগ পেয়েছেন, তারা সে বিদ্যালয়ের নামে বেতন ভোগ করছেন। কিন্তু ডেপুটেশনে গিয়ে থাকছেন রাঙামাটি পৌর শহরে, যেখানকার বিদ্যালয়ে কোনো শূন্য পদ নেই, অথচ প্রতিটি বিদ্যালয়ে ডেপুটেশনের শিক্ষক আছেন।

শিক্ষক সমিতির সভাপতি আরো বলেন, ‘অন্যদিকে কোনো শিক্ষককে যে স্কুল থেকে  ডেপুটেশনে নেয়া হয়, ওই স্কুলে তার পদটি শূন্য দেখায় না। ফলে তার পদে কাউকে নেওয়া যায় না। ’

ডেপুটেশনের বড় শিকার বাঘাইছড়ি উপজেলার মাহিল্যা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যলয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘আমার বিদ্যালয়ে ডেপুটেশন ঠেকাতে অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু কাজ হয়নি। এখন প্রতি শিক্ষার্থী থেকে মাসে ১০ টাকা হারে চাঁদা নিয়ে চারজন খ-কালীন শিক্ষক রেখেছি। ডেপুটেশনরা শহরে থাকলেও আমার বিদ্যালয় থেকেই বেতন ভোগ করছেন।’

শিক্ষার এই অবস্থায় হতাশা প্রকাশ করে শিক্ষাবিদ নিরূপা দেওয়ান বলেন, ‘জেলা পরিষদের কাছ থেকে আমরা ভালো কিছু প্রত্যাশা করি। কিন্তু এই ধরনের অবস্থা আমাদের হতাশ করে।’

নিরূপা বলেন, ‘উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দার সনদ দেখিয়ে চাকরি নেন শিক্ষকরা। বাস্তবে আসলে তা নয়। একজন শিক্ষক কর্মস্থল ফেলে বছরের পর শহরে পড়ে থাকছে, অথচ কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।’ হাজারো শিশুর স্বার্থ না দেখে ব্যক্তি শিক্ষকের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া জেলা পরিষদের ব্যর্থতা বলে মন্তব্য করেন তিনি।

রাঙামাটি জেলা পরিষদের সদস্য সুবীর চাকমা এমন ব্যাপক ডেপুটেশনের বিপক্ষে। তিনি বলেন, ‘এখন দেখা যাচ্ছে ডেপুটেশনে আসা শিক্ষকরা বিদ্যালয়ের মূল শিক্ষকদের মূল্যায়ন করছে না। এতে শিক্ষকদের মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হচ্ছে।’

ডেপুটেশনের বিরোধিতার কথা জানিয়ে জেলা পরিষদের আরেক সদস্য রেমলেয়ানা পাংখো বলেন, ‘আমিও এর বিপক্ষে। আমার বিলাইছড়ি উপজেলা থেকে মাত্র একজন ডেপুটেশনে আনা হয়েছে।’

রাঙামাটি সদর উপজেলা চেয়ারম্যান অরুন কান্তি চাকমা বলেন, আমার উপজেলায় কাউকে ডেপুটেশনে আনা হলে উপজেলা শিক্ষাসংক্রান্ত কমিটির মতামত নেওয়া দরকার। কিন্তু তা নেওয়া হয় না। শুধু একটি কাগজ ধরিয়ে দিয়ে তাদের বেতনের ব্যবস্থা করে দিতে বলা হয়। এভাবে চলতে থাকলে দুর্গম এলাকার প্রাথমিক শিক্ষা অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রাঙামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বৃষকেতু চাকমা বলেন, ‘আমার হাতে প্রতিনিয়ত ডেপুটেশনের আবেদন আসছে। সঙ্গে রাজনৈতিক চাপও আসে। এটি পুরো বন্ধ করতে আমি চেষ্টা করছি। ডেপুটেশনে যাদের আনা হয়েছে, তাদের নির্ধারিত সময় শেষে ফেরত পাঠানো হবে আগের কর্মস্থলে। নতুন করে আর কাউকে সুযোগ দেওয়া হবে না।’

-ঢাকা টাইমস

আপনার মন্তব্য

আলোচিত