শিরোনাম

  ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জন্য মাতৃভাষায় পুস্তক প্রকাশনার বিধান রেখে খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা   সরকারী চাকরিতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য কোটা না হলেও সমস্যা হবে না   রুয়েটে ভর্তি পরীক্ষার আবেদন শুরু   দুই আদিবাসী কিশোরী ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্তদের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি   দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টি অথবা বজ্রবৃষ্টি ও ভারী বর্ষণ হতে পারে   আদিবাসী মানবাধিকার সুরক্ষাকর্মীদের সম্মেলন ২০১৮ উদযাপন   ব্লগার বাচ্চু হত্যার সঙ্গে ‘জড়িত’ ২ জঙ্গি নিহত   জুমের বাম্পার ফলনে রাঙ্গামাটির চাষিদের মুখে হাসি   সরকারি চাকরিতে আদিবাসী কোটা বহাল দাবি জানাল আদিবাসীরা   আয়ারল্যান্ড প্রবাসী বাংলাদেশের এক মন্ত্রী দ্বারা হেনস্ত হওয়াতে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নিন্দা   শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি পেয়েছে   মিয়ানমারে রয়টার্সের দুই সাংবাদিককে সাত বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত   শহীদ আলফ্রেড সরেন হত্যার ১৮ বছর: হত্যাকারীদের দ্রুত বিচারের দাবি জাতীয় আদিবাসী পরিষদের   ভারতের কাছে ১-০ গোলে হেরেছে বাংলাদেশের মেয়েরা   সরকারী চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধা ছাড়া সব কোটা বাতিল হচ্ছে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী   জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান মারা গেছেন   ঈদের ছুটি কাটানো হলোনা টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার নিরীহ ধীরাজ চাকমার   খাগড়াছড়িতে পৃথক ঘটনার জন্য জেএসএস(সংস্কারবাদী) ও নব্য মুখোশ বাহিনীকে দায়ী করেছে : ইউপিডিএফ   নানিয়ারচর থেকে খাগড়াছড়ি   খাগড়াছড়িতে ৬ জনকে গুলি করে হত্যা !
প্রচ্ছদ / খোলাকলাম / সরকার ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন করতে পারলে, পার্বত্য এলাকার সেটেলারদের কেন নয়?

সরকার ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন করতে পারলে, পার্বত্য এলাকার সেটেলারদের কেন নয়?

প্রকাশিত: ২০১৮-০৫-২৪ ১৫:০৭:১৯

   আপডেট: ২০১৮-০৫-২৪ ১৮:০৬:১৮

আবিদ হোসেন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণকারী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে শিগগিরই এক লাখ রোহিঙ্গাকে কক্সবাজারের টেকনাফের শিবির থেকে ভাসানচরে স্থানান্তর করে পুনর্বাসন করা হবে।

তাঁর সরকার বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের মানবিক দৃষ্টিকোন থেকে আশ্রয় প্রদান করেছে। কারণ, বাংলাদেশের জনগণেরও এ ধরনের শরণার্থী হবার মত অভিজ্ঞতা রয়েছে। বাংলাদেশের স্থানীয় জনগণ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য তাদের সবরকম সহযোহিতার হাতকে প্রসারিত করেছে এমন মন্তব্য করেছেন তিনি।

মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া হয়েছে সেটা প্রধানমন্ত্রীর ধন্যবাদের প্রাপ্য। আমি খোলা মনে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। যিনি মিয়ানমার থেকে নির্যাতনের মুখে পালিয়ে আসা লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছেন। আন্তর্জাতিকভাবে সুনাম অর্জন করেছেন।

তবে প্রধানমন্ত্রী নিজ দেশের জনগণের প্রতি আরো যদি আত্মচেতন অনুভব করতেন তাহলে দেশের অভ্যন্তরীণ অনেক ইস্যু সুরাহা হতো বলে আমার মনে হয়।

যেমন- পার্বত্য চট্টগ্রামে যিনি ১৯৯৭ সালে 'পার্বত্য চুক্তি' করেছিলেন তা এখনো পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করা হয়নি। যার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামে অহরহ অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। পার্বত্য চুক্তির ফলে শান্তির প্রত্যাশা জন্ম নিলেও, শান্তি আসেনি এখনো। উদাহরণস্বরুপ সম্প্রতি ঘটে যাওয়া সমীহ-জাগানো হত্যাকান্ড।

উল্লেখ্য যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বন্ধ এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার ও জনসংহতি সমিতি চুক্তি সই করেছিল। এতে স্বাক্ষর করেন বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ এবং শান্তি বাহিনীর পক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু)।

শান্তি চুক্তি করার মূল উদ্দেশ্য ছিল পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনা।চুক্তির কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইউনেস্কো শান্তি পুরস্কারও পেয়েছিলেন বলে জানা গেছে। সেই লক্ষ্যে সরকার এবং জেএসএসের মধ্যে দ্বিপার্শ্বিক বোঝাপড়া ভিত্তিতে চুক্তিটি করা হয়েছিল।

কিন্তু চুক্তির ২০ বছর পূর্ণ হলো। এখনো চুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নি হয়নি বলে পাহাড়িদের অভিযোগ। চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ায় পাহাড়ি জনগোষ্ঠী ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। দুই দশকেও পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন হয় নি। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়ায় জুম্ম জনগণের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে বলে সন্তু লারমার অভিযোগ।

পার্বত্য সমস্যার মূল ইস্যু্র 'ভূমি' প্রেক্ষা থেকে যেটা অনুধাবন করা যায় সেটা হল- পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের পথে যে সংকট তৈরি হচ্ছে তা অন্যতম কারণ হিসেবে রাজনৈতিক তদারকি প্রয়োজন ছিল কিন্তু তা করা হয়নি।

চুক্তিতে বলা আছে ‘একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির দ্বারা পার্বত্য ভূমি কমিশন প্রতিষ্ঠত হবে।’ ভূমি কমিশন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সুতরাং চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ন ধারা বাস্তবায়িত হয়েছে। আদতে কি তাই, শুধু ভূমি কমিশন করেই কি পাহাড়ের আদিবাসীদের ভূমির সমস্যা মিটেছে?

২০ বছর আগে যে লড়াই পাহাড়ে হয়েছিল সেটা শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য। শান্তি চুক্তির মাধ্যমে সেটি প্রতিফলিত হয়েছে। কিন্তু চুক্তি বাস্তবায়িত হচ্ছেনা এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে কাজ করছে জাতাভ্যিমান ও অবিশ্বাস।

'আমি মনে করি পার্বত্য মূল সমস্যার পিছনে যেটা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত সেটা হল ভূমি সমস্যা'। এই বাক্যটি শুধু আমি উচ্চারণ করছি তা নয় গোটা পার্বত্য এলাকার জুম্মজনগণের জনরোষে বাক্যটি এখনো প্রচলিত। কারণ ভূমির কারণে আজকে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাগুলো জটিল থেকে আরো তীব্র হয়ে উঠছে। সরকার এত বছর ক্ষমতা থাকার পর ও যদি চুক্তি মূল সমস্যাগুলো বাস্তবায়ন করতে না পারে তাহলে অবশ্যই সরকারের ব্যর্থতার শামিল।

পার্বত্য চট্টগ্রামে আজ হাজার হাজার পাহাড়িদের ভিটামাটি সেটেলার কর্তৃক দখল হয়ে আসে। কিছুদিন আগেও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার দীঘিনালা উপজেলার বাবুছড়া এলাকায় সাধনাটিলায় আদিবাসী অধ্যুষিত বিহারের জায়গা দখল করতে গিয়েছিল সেটেলার বাঙ্গালিরা। সেদিন তারা পুরোপুরিভাবে প্রস্তুত হয়ে গৃহস্থালির জিনিসপত্র সহ দখল করতে যায়। কিন্তু জুম্মগণের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্ঠায় সেদিন প্রতিবাদের মুখে আবারো ব্যর্থ হয়েছে তারা। এর আগেও একবার দখল করতে আসে। সেসময় ও ব্যর্থ হয়।

এভাবে প্রতিনিয়ত পার্বত্য চট্টগ্রামে সেটেলারদের দখলবাজি প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। সরকার- প্রশাসন এ ব্যাপার তো একদম নীরব ভূমিকা পালন করে আসছে বলে তো মনে হয় , সরকারের দায়িত্বশীল মহল যদি সজাগ থাকতো তাহলে পাহাড়িদের আজ এ ব্যবস্থা হতো না। হারিয়ে যেত না তাদের আদি-ভুমি। পার্বত্য চট্টগ্রাম একসময় ছিল সবুজ অরন্যে ভরা ভূমি। কিন্তু তা এখন আর দেখা যায়নি। সমতল থেকে যাওয়া লক্ষ লক্ষ সেটেলার বাঙালি গাছপালা কেটে-বনজংঙ্গল সাবাড় করে ঘরবাড়ি-রাস্তাঘাট বানিয়েছে। পর্যতনের নাম করে পাহাড়ীদের বাস্তভিটা দখল করে মনুষ্যসৃষ্ট পর্যটন করা হয়েছে।

এতে একদিকে বন উজাড় ও পাহাড় কেটে পরিবেশের ভারসাম্য ক্ষতি করা হয়েছে অন্যদিক  এক যুগে পার্বত্য চট্টগ্রামের এক-চতুর্থাংশ বনভূমি ধ্বংস করা হয়েছে।

সম্প্রতি বিভিন্ন গবেষণার ফলাফল ও বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, পাহাড়ের ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট করে নির্মাণ করা হয়েছে একের পর এক সড়ক। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে গড়ে তোলা হয়েছে বসতি-অবকাঠামো। এতে ভূতাত্ত্বিক গঠন নষ্ট হয়ে পাহাড় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর সঙ্গে অতিবৃষ্টি যোগ হয়ে বড় ধরনের ধস ও বিপর্যয় ঘটেছে।

ভৌগোলিক বুনন ও গঠন নষ্ট করে সড়ক নির্মাণের পর পাহাড়গুলোর ওপর আরেক বিপদ তৈরি করে বসতি স্থাপনকারীরা। সড়ক নির্মাণের ফলে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠা পাহাড়গুলোতে বসতি স্থাপন বেড়ে গিয়ে বড় বিপর্যয়ের পরিস্থিতি তৈরি করে।

আমি প্রায়ই সময় পাহাড়ি বন্ধুদের সাথে রাঙ্গামাটিতে ঘুরতে যেটাম। রাঙ্গামাটিতে বিভিন্ন এলাকায় ও শহরে ঘুরাফেরা করেছি। আর দেখেছি বিভিন্ন জায়গায় পাহাড় কেটে উঁচু উঁচু জায়গায় ঘরবাড়ি-দোকানপাট করা হয়েছে। সবচেয়ে ভয় পেয়েছিল রাঙ্গামাটি শহরের ভেদভেদীস্থ রুপনগর এলাকায়। কি ভয়ংকরভাবে ওরা বসবাস করছে।

আমার বন্ধু সুদিপ্ত দেওয়ানের কাছে জিজ্ঞেস করেছিলাম। এখানে কিভাবে ওরা বসবাস করছে তাদের কি ভয় করেনা? ও বলল এখানে বেশীরভাগ সেটেলার বসবাস করে। পাহাড় কেটে খুব রিস্ক নিয়ে সেসব জায়গায় প্রায় কয়েক শত পরিবার রয়েছে। সচেতনতার অভাবে গতবছর সেই জায়গায়তে পাহাড় ধসে অনেক মানুষ মারা যায়।গেল বছর পাহাড়ধসের যে বিপর্যয় ঘটেছে, তা স্মরণাতীতকালের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ। কয়েক যুগ ধরে নানামুখী ‘অত্যাচারের’ ফলে ওই তিন পার্বত্য জেলার পাহাড়ের সামগ্রিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেছে ।

পাহাড়ে জায়গা বেদখল ও জনবসতি হতে হতে ভবিষ্যতে পায়খানা গর্ত খুড়ার মত জায়গা পাবেনা কেউ।

এরমধ্যে শুরু হয়েছে আবার রোহিঙ্গা সংকট। লাখ লাখ অসহায় রোহিঙ্গা কক্সবাজারে বিভিন্ন শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে। শুধু তাই নয় পার্বত্য এলাকায় ও ঢুকে যাচ্ছে তারা। জানা গেছে কিছু স্বার্থনেশী মহল অর্থের বিনিময়ে পাহাড়ি এলাকায় বিভিন্ন স্থানে শিথিল করে দিচ্ছে।

রোহিঙ্গা ইস্যুকে নিয়ে পার্বত্য এলাকার ইস্যুর সাথে জড়াচ্ছি সেটা নয়। আমার মনে হচ্ছিল রোহিঙ্গা সমস্যা তো ইদানিং সমস্যা। যে সমস্যাকে সরকার গুরুত্ব দিয়ে নোয়াখালির হাতিয়া উপজেলার ভাসানচরে পুনর্বাসন করবে বলে ঠিক করেছেন তার আগে দেশের স্বার্থে জনগণের মঙ্গলের উদ্দেশ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য এলাকার অস্থায়ী সেটেলার বাঙ্গালিদের স্বসম্মানে পুনর্বাসন করা যেত। এতে আওয়ামীলীগের ভাবমূর্তি আরো উজ্জল হত। সংখ্যালঘুদের মাঝে ক্ষমতাসীন দলের সহায়ক আস্থা ফিরে এত।কারণ চুক্তি অনুযায়ী- পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে সেটেলার বাঙালিদেরকে যথাযথ ও সম্মানজনকভাবে পুনর্বাসন করা। কিন্তু দীর্ঘ ২০ বছরেও সেটি পূরণ করা হয়নি। বরং এর বিপরীতে করা হচ্ছে উল্টো দিক। শান্তিচুক্তির মোতাবেক যদি প্রধান ধারাগুলো বাস্তবায়ত হতো তাহলে হয়ত চুক্তির সমস্যা অনেকটা নিরসন পেত।

লেখকঃ আবিদ হোসেন।

ছাত্রঃ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এগ্রিকালচার এন্ড টেকনোলজি, উত্তরা ঢাকা।

মতামত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব।

আপনার মন্তব্য

এ বিভাগের আরো খবর



আলোচিত