শিরোনাম

  বিএনপিকে আবারো সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে আখ্যায়িত করেছে কানাডার আদালত   ৮০ বছর বয়সে প্রথম ভোট দিলেন   সীতাকুণ্ডে দুই আদিবাসী কিশোরীর খুনিদের গ্রেফতার ও শাস্তির দাবি   গবেষণার কাজে ব্যবহার উদ্দেশ্যে মরণোত্তর দেহদান করলেন তসলিমা নাসরিন   প্রাথমিকে এক লাখ ৬৫ হাজার শিক্ষক নিয়োগ   আর্জেন্টিনার চূড়ান্ত দল ঘোষণা   মাদকবিরোধী অভিযানে বন্দুকযুদ্ধে নিহত আরো ১১   খাগড়াছড়িতে গুলি করে ১ জনকে হত্যা, দু পক্ষের মধ্যে গুলি বিনিময়   দুই আদিবাসী ত্রিপুরা কিশোরী হত্যাকান্ডের ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান চাকমা রাণী   আদিবাসীদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদের মুখে আবারো ব্যর্থ হয়েছে সেটেলারদের দখলবাজি প্রচেষ্টা   ত্রিপুরা রাজ্যে ভয়াবহ বন্যা, পানির নিচে ৩ হাজার বাড়ি   বান্দরবানে অবৈধভাবে পাহাড় কাটার সময় মাটি চাপায় ৫ জন নিহত   অপরাধীদেরকে আইনের আওতায় এনে বিচার করা হোক : সুলতানা কামাল   কক্ষপথে পৌঁছাল বাংলাদেশ   আজ ২০ মে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের ২৯ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী   প্রিন্স হ্যারির রাজকীয় বিয়ের ছবি   সীতাকুন্ডে দুই আদিবাসী কন্যা শিশু ধর্ষণ ও হত্যার বিচার এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমুলক শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন   দুই আদিবাসী কিশোরী হত্যাকারী আবুল হোসেনের ফাঁসির দাবি   প্রেমের প্রস্তাবে ব্যর্থ হয়ে আবুল হোসেন দুই আদিবাসী কিশোরীকে হত্যা করেছে   সীতাকুণ্ডে ২ আদিবাসীকে কিশোরীকে ধর্ষণের পর হত্যায় মামলা
প্রচ্ছদ / খোলাকলাম / কোটা ব্যবস্থায় আমরা বাসের ছাদে উঠে প্রতিদিন স্কুলে যাই || তেপান্তর চাকমা

কোটা ব্যবস্থায় আমরা বাসের ছাদে উঠে প্রতিদিন স্কুলে যাই || তেপান্তর চাকমা

প্রকাশিত: ২০১৮-০৫-১৪ ১৯:৪৯:২৭

   আপডেট: ২০১৮-০৫-১৪ ২০:১২:১৯

ছবি: ফেসবুক থেকে সংগৃহীত।

তেপান্তর চাকমা

বিষয়টা নিয়ে একটু দীর্ঘ সময় ব্যয় করে ২৭-৩৩ তম বিসিএস ক্যাডার বড় ভাইদের সাথে সাক্ষাৎ করে একটু সময় নিয়ে লিখবো ভেবেছিলাম।কিন্তু নিজেই সময় বের করতে পারছিনা,এক ট্রাইমিষ্টারে ঈদ ২ টা এক যোগে পরার কারনে পরীক্ষা ক্লাস সব কিছু এগিয়েছে।তাই সামান্যতম সময় নিয়ে একটু লিখতে বসলাম।কারোর কাছে নিজেদের যুক্তিবাদ থাকলে কমেন্ট করতে পারেন,আর আমিও চেষ্টা করবো আপনাদের যুক্তি খন্ডন করতে।
.
বেশ কয়েকদিন আগে,দেশের ছাত্র সমাজ ফেসে-ফুপে ওঠেছিলো কোটা ভিত্তিক নিয়োগ প্রকিয়া নিয়ে।যদিও বিতর্কিত ধারাতে এই ছাত্র সমাজের নেতৃত্ব বিএনপি-জামায়াত শিবিরের অন্তর্ভুক্ত থাকা কোন ছাত্র কর্তৃক্ষ হওয়ায় রাজনৈতিক বিষয় নিয়েও প্রশ্নবিদ্ধ থাকে।তবে সারা দেশের ছাত্র সমাজ যে এই আন্দোলনে সামিল হয়েছে তা ইতিবাচক ও বটে।
.
দেশরত্ন শেখ হাসিনার কোটা সংস্কারের ঘোষনার পর ও আন্দোলন কারীরা আন্দোলন চালিয়া যাওয়ার দৃষ্টিটা যদি ইতিবাচক রুপে দেখেন,তাহলে নিশ্চই সরষের মধ্যে ভূত খুঁজে পাওয়া যায়।বাট রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বাদ দিয়ে একজন লেখকের দৃষ্টিকোনে আমার পাহাড়ের কোটা নিয়ে একটু ইতিবাচক হোক বা নেতিবাচক হোক যার দৃষ্টিকোনে যেই ভাবে লেখাটি গ্রহন করবেন সেইভাবেই আলোকপাত করতে চাচ্ছিলাম।
.
কোটা আন্দোলন নিয়ে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বন্ধু তার টাইমলাইনে পোষ্ট করেছিলেন ঠিক এই ভাবে:'একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান একজন উপজাতি মেয়েকে বিয়ে করলেন।তাদের মধ্যে একজন ফুটফুটে প্রতিবন্ধি বাচ্ছা হলো।তবুও তারা সুখী,কারন তাদের সন্তানের চাকরির জন্য চিন্তা করতে হবেনা।
 
একটু গভীরভাবে পড়ে দেখুল উল্লেখিত লেখাটি।তবে আগেই বলে রাখি,বন্ধুটিকে হেয় বা অপমান করতে আমার এই লেখাটি নই।বরং তার প্রশ্নের উত্তরটি দিতেই একটু উপস্থাপিত করেছি তার মন্তব্যটিকে।
.
২০১১ সালে তখন আমি নিও টেন (দশম শ্রেনী) তে ওঠলাম তখন National Children Task force এর Save The Children,Australia(বর্তমানে আন্তর্জাতিক) এর খাগড়াছড়ি জেলার সাংবাদিক হিসেবে জেলার প্রতিনিধি ছিলাম সাথে ৪ মাস পর পর 'শিশু দর্পন' নামক একটা পত্রিকা প্রকাশ করতাম।যার পুরোটা ব্যয় Save the children বহন করতো।উল্লেখ্য বিষয় যে,বাংলাদেশ প্রেস কাওন্সিল থেকেও সাংবাদিকটা বিষয় ও পত্রিকা প্রকাশনার বিষয়ে ট্রেনিং পেয়েছি।
.
সেই সময় শিশুদের রিপোর্ট সংগ্রহের জন্য খাগড়াছড়ি জেলার শেষাংশ আর রাঙ্গামাটি জেলার সীমানা ঘেষে দূর্গম একটা পাহাড়িয়া অঞ্চলে গিয়েছিলাম যেখানে সকাল ৬ টা থেকে বাড়ি থেকে বের হয়ে উক্ত স্থানো পৌছেছিলাম রাত ১১ টার দিকে।হাটতে হাটতে পায়ের আর শরীরের অবস্থা এতটাই কাহিল হয়েছিলো যে,এক টানা ৪৮ ঘন্টা বিছানাই কেটে দিয়েছিলাম আমি।
 
আরো ১ টা ঘন্টা হাটতাম খাগড়াছড়ি মাইসছড়ি বাজার দিয়েই বের হতে পারতাম।কিন্তু আঞ্চলিক ভাতৃত্বঘাটি সংঘাট কারনে আমার জন্য পারমিট ছিলো উক্ত এলাকাটির পর্যন্ত।
.
গাড়ি থেকে নেমে কখনো পাহাড় ডিঙ্গিয়ে,কখনো বা পাহাড়ি ছড়া পেরিয়ে,কখনো বা ২ টা পাহাড়ের মাঝখান বুক ঘেষে গিয়েছিলাম উক্ত এলাকায়। আমার মতন ট্রাভেলার যেখানে সময় নিতে হয়েছে পাক্কা ৫ ঘন্টার মতন একটানা হাটার,আর সেইখানে স্থানীয়দের নাকি লাগে ১.৫০ ঘন্টা।তারমানে ওনারা কতটুকু এডভান্স তা একটু ভেবে ও দেখতে পারেন।
.
স্থানীয় কার্বারীর বাড়িতে খাওয়া দাওয়া চলে।খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের অর্থায়নে একটা স্কুল দেখলাম,ছাত্র/ছাত্রীরা ও আশানরুপ।কিন্তু সমস্যা হলো কোন শিক্ষক স্কুলে আসেননা।এমনকি বছরে ১ টি বার ও আসেন কিনা সন্দেহ।আবার তারমধ্যে বর্ষার ৬ টা মাস তো পাহাড়িয়া রাস্তায় আসা-যাওয়া দুষ্কর।
 
কারন পাহাড়ি ঝরনার স্রোতের ধারার সম্পর্কে সবাই জ্ঞাত।তারপর ও স্থানীয় শিশুদের,অভিভাবকের শিক্ষামূখী চেতনা যে কাজ করছে তা দেখে একটু শান্তি পেলাম নিজের মধ্যে।জুম পাহাড়ের এই গভীর অরন্যের মধ্যেও যে,শিশুদের অভিভাবকরা মৌলিক চাহিদার অংশ হিসেবে শিক্ষার গুরুত্বকে বুঝতে পেরেছে।
.
এইসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক আছে কিন্তু আবার শিক্ষক নেইও বটে।এলাকাবাসী আর শিক্ষকরা মিলে একজন শিক্ষক রেখেছেন বার্ষিক ভিত্তিতে।সেই নিজেই সব ক্লাস গুলো করাতো আর সাথে বার্ষিক ভিত্তিতে শিশুদের অভিভাবকের সাথে চুক্তি করে শিশুদের টিওটর করতো।যারা ভাষা হিসেবে নিজেদের মাতৃভাষা 'চাকমা' ভাষাতেই নিজেদের মধ্যে কমিনিকেট করতো।
 
এইসব বিষয়ে আমি অনেকটা কারোর অজান্তেই গিয়েছিলাম।কারন স্কুল সমিটি,শিক্ষকদের থেকে সাংবাদিকতা পরিচয়ে যে প্রশ্ন করবো সেই সুযোগ নেই।কারন উক্ত স্থানটি আঞ্চলিক রাজনীতির ঘাটি,যেখানে অস্ত্রের ঝলকানিতেই কারোর ঘুম ভাঙ্গে।এইবার প্রশ্ন হলো,এই স্থান থেকে বেরে ওঠা একটা শিশু কি,শহুরে জীবনের কিন্টারগার্ডেন শিশুর মেধার সাথে পেরে ওঠবো পারবি কি?
.
একটু হলেই আমাদেরকে কোটা নিয়ে সমতলের বন্ধুরা খোচা মারেন।কিন্তু আমাদের শিক্ষার বাস্তবতার ধারা সম্পর্কে এই বন্ধুরা কতটুকুই বা শিক্ষিত?
.
জানেন স্কুলের বারান্দায় দাড়িয়ে আমার বাঙ্গালী বন্ধুরা যখন আন্তর্জাতিক ভাষায় My name is অমুক সমুক শিক্ষা নিয়ে ব্যস্ত থাকে তখন পাহাড়ের কোনে জুম পাহাড়ের কোনে একজন পাহাড়ি শিশু আপনাদের মাতৃভাষা বাংলায়,আমার নাম তেপান্তর চাকমা শিক্ষা নিয়ে ব্যস্ত থাকে?
.
কারন ইংরেজি ভাষাটা আপনাদের কাছে যেমনটা অর্জন করে শিখতে হয় ঠিক তেমনটা চাকমা-মারমা সহ ১১ টা সম্প্রদায়ের ১৩ ভাষা-ভাষির পাহাড়ি শিক্ষার্থীরা বাংলা ভাষাটাও আদায় করে নিতে হয়।
 
আপনানা ক খ অ আ সাথে পরিচয় হতে পারলেই বাকিটা আদার করে নিতে পারেন।কারন আপনাদের মাতৃভাষার ওপরেই শিক্ষা এটি।আর আমি নিজেই ছোট বেলায় ক তে আকার দিলে কা,ই-কার দিলে কি উ কার দিলে কু,ঊ কার দিলে কূ করে শিখে এসেছি।কারন এই ভাষাটা আমার মাতৃভাষা নই,তাই আমাকে ওই ভাবেই জ্ঞানটা অর্জন করে নিতে হয়েছে।যেমনটা আপনারা সেই সময় ইংরেজিতে টেনস-প্রিপারেশন শিক্ষা নিয়ে সেই সময়টা ব্যস্ত থাকেন।
.
কষ্ট লাগে যখন আমাদের সমতল কিংবা বাঙ্গালী কোন বন্ধু আমাদের কোটা নিয়ে খোচা মারে।২০১৮ সালের ৯ ই জানুয়ার চট্টগ্রামের ২২ জনের বন্ধুদের একটা টিম নিয়ে আলুটিলা পাহাড়ে ট্রেকিং করতে নিয়ে গিয়েছিলাম।
 
প্রায় ৩ ঘন্টার পাহাড়ি ঝর্ণা,পাহাড় ডিঙ্গিয়ে আলুটিলা ঝর্ণা হয়ে ট্রেকিং সমাপ্ত ঘোষনা করেছি।তাতেই বন্ধুরা আমাকে এখনো ক্ষেপাতো,শালার কত্তদূর নিয়ে গেছস।জানেন সেই স্থান থেকে জীবক ত্রিপুরা নামে ৮-৯ বছর বয়সী একদল শিশু শিক্ষা অর্জনের জন্য সদর এলাকাতেই আসে।যারা আমার বন্ধুদের দেখে ভয়েই কেঁদে ওঠেছিলো।
.
হয়তো বাড়ি ফিরেই ক্লান্ত শরীরে ঘুমিয়ে পরা জীবক ত্রিপুরাদের মেধা শহুরে জীবনের সেই শিশুদের তুলনায় নেহাৎ একটু কম?কিন্তু কোটা মানেই যে,একেবারে আমরা মেধাবী না,অযোগ্য না এমনটাও কিন্তু নই।
.
তথ্যসূত্র অনুযায়ী ৩৮ তম বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিলো ৩ লক্ষ ৮৯ হাজার ৪ শত ৬৮ জন।মানে প্রায় ৪ লাখের কাছাকাছি।অংশগ্রহণের জন্য কোন কোটা নেই অবশ্যই।আর প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় পাশ করেছে মাত্র ১৬ হাজার ২শত ৮৬ জন।এখানেও কোন কোটা নেই। এই ১৬ হাজার ২শত ৮৬ জনের সকলে লিখিত পরীক্ষা দেবেন।
.
ধরা যাক লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারবে ১০ হাজার।একটু বাড়িয়েই ধরলাম (৩৭ তম বিসিএস এ লিখিত পরীক্ষায় পাশ করেছিলো ৫ হাজার ৩৭৯ জন)। এখানেও কোন কোটা নেই।
 
এখন লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এই ১০ হাজার মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ পাবে মাত্র ২ হাজার চব্বিশ জন।এবং ঠিক এখানেই কোটা হিসাব করা হবে।
.
৪ লক্ষ থেকে ১০ হাজারে ঠাঁই করে নেয়া এই তালিকার কাকে আপনি মেধাহীন বলবেন?
 
এরা প্রত্যেকেই মেধাবী এবং চাকরী পাওয়ার যোগ্য নয় কি?আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, এই ১০ হাজারের একজনও কম মেধাবী বা অযোগ্য নয়।সে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের হোক বা না হোক, নারী হোক বা না হোক, প্রতিবন্ধী হোক বা না হোক, আদিবাসী হোক বা না হোক।
(তথ্যসূত্র:শাশ্বতী বিপ্লব,তরুন কবি ও সাহিত্যিক)
.
সারাদেশের ৪ লক্ষের পরীক্ষার তালিকা থেকে ১০ হাজার মেধাবীর মধ্যে উত্তীর্ন হওয়া আমার জুম পাহাড়ের সেই শিক্ষক বিহীন স্কুলের ছাত্র/ছাত্রীটিকে নিয়ে যে,আপনার খোচা মারেন,লজ্জা লাগে কি আপনাদের?
 
বাট পাহাড়ের একজন ক্ষুদ্র জাতিসত্বার লোক হিসেবে আপনাদের খোচা দেখে আমারই লজ্জা লাগে,আর প্রতিবাদটা মুচকি হাসি দিয়েই করি......
কারন আমিও একজন শিক্ষিত পরিবারের,শিক্ষিত সন্তান।
 
লেখক: তেপান্তর চাকমা
প্রাক্তন শিশু সাংবাদিক,
ন্যাশনাল শিশু টাস্ক ফোর্স,
সেভ দ্যা চিলড্রেন ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ, খাগড়াছড়ি শাখা।
 
 

প্রকাশিত মতামত ও প্রতিবেদন লেখকের একান্তই নিজস্ব। ডেইলি সিএইচটি - এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে।

আপনার মন্তব্য

এ বিভাগের আরো খবর



আলোচিত